
ঠাকুরগাঁওয়ে বিজিবির গুলিতে তিনজন নিহতের ঘটনায় মামলা কলেজছাত্রের ,,
গরু জব্দকে কেন্দ্র করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের গুলিতে এক স্কুলছাত্রসহ তিনজন নিহত হওয়ার সাড়ে ৬ বছর পর অবশেষে আদালতে মামলা হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার বহরমপুর গ্রামের সেই ঘটনার বিচার চেয়ে সোমবার (২৮ জুলাই) আদালতে এই হত্যা মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী এক কলেজছাত্র, যিনি ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিজের একটি চোখ হারিয়েছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক রাজিব কুমার রায় মামলাটি গ্রহণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। দেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর বিচার পাওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে—এমনটা মনে করেই ভুক্তভোগীরা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানান।
সেদিন যা ঘটেছিল
২০১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বহরমপুর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বৈধভাবে কেনা গরু বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে হরিপুরের বেতনা সীমান্ত ফাঁড়ির বিজিবি সদস্যরা গরুগুলোকে ভারতীয় চোরাই গরু সন্দেহে আটক করে।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, গরুর বৈধ কাগজপত্র দেখালেও বিজিবি সদস্যরা তা অগ্রাহ্য করে এবং গরু নিয়ে যেতে উদ্যত হয়।
এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে বিজিবি সদস্যরা গ্রামবাসীদের ওপর চড়াও হন এবং একপর্যায়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন প্রাণ হারান।
নিহতরা হলেন—দিনাজপুর সরকারি কলেজের ছাত্র মো. নবাব (২৬), রুহিয়া গ্রামের মো. সাদেক (৩৬) এবং বহরমপুর গ্রামের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র জয়নুল (১২)। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন আরো অন্তত ১৮ জন।
তবে ঘটনার পরপরই বিজিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, সশস্ত্র চোরাকারবারিরা ভারতীয় গরু পাচার করছিল। বিজিবি সদস্যরা গরু জব্দ করতে গেলে চোরাকারবারিরা সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালায়। তখন আত্মরক্ষার্থেই বিজিবি গুলি চালাতে বাধ্য হয়।
বিচারহীনতার সাড়ে ৬ বছর
ঘটনার পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক কে এম কামরুজ্জামান সেলিমের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে সেই তদন্ত প্রতিবেদনের ফল আলোর মুখ দেখেনি।
ভুক্তভোগীরা বিচার তো পাননি, উল্টো বিজিবির পক্ষ থেকে তাদের নামেই দুটি মামলা করা হয়। সেই দিনের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ডান চোখ হারানো মো. আবুল কাশেম এখন মামলার বাদী।
তিনি বলেন, ‘আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। পথে দেখি বিজিবি আর গ্রামবাসীর মধ্যে ঝামেলা চলছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি গুলি এসে আমার চোখে লাগে। আমরা বারবার থানায় মামলা করতে গিয়েছি, কিন্তু পুলিশ আমাদের মামলা নেয়নি। উল্টো বিজিবির মামলায় আমাকে দুইবার জেল খাটতে হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘গত বছর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে মামলা করার মতো একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাই ন্যায়বিচারের আশায় আজ আদালতে এসেছি। আশা করি, এবার আমরা বিচার পাব।’
আইনজীবীর বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী বকুল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ভয় ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ভুক্তভোগীরা কোথাও অভিযোগ করার সাহস পাননি। আজ আদালত মামলাটি গ্রহণ করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এটি ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে একটি বড় পদক্ষেপ।’
মামলায় আসামি করা হয়েছে বেতনা বিওপির তৎকালীন নায়েক মো. হাবিবুল্লাহ, নায়েক মো. দেলোয়ার হোসেন, সিপাহী মো. হাবিবুর রহমান, সিপাহী মো. মুরসালিন, সিপাহী মো. বায়রুল ইসলাম এবং নায়েক সুবেদার মো. জিয়াউর রহমানসহ অজ্ঞাতনামা আরো ২-৩ জনকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হরিপুর থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাকারিয়া মন্ডল বলেন, ‘ঘটনাটি অনেক পুরোনো। ভুক্তভোগীরা থানায় আসেননি। আদালতের নির্দেশনার কোনো কাগজ আমরা এখনো পাইনি।’
একইভাবে ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবির বর্তমান অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানজীম আহমেদ বলেন, ‘ঘটনাটি আমার যোগদানের অনেক আগের। মামলার বিষয়ে আমি অবগত নই এবং দাপ্তরিকভাবে কোনো নোটিশ পাইনি।’
সাড়ে ছয় বছর ধরে চাপা থাকা একটি সহিংস ঘটনা নতুন করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আসায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে ন্যায়বিচার পাওয়ার একটি নতুন আশা তৈরি হয়েছে। এখন পিবিআইয়ের তদন্তের দিকেই তাকিয়ে আছেন সবাই।
জয়নুল আবেদীন
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

