পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায়
বাঙালি নারীকে সংসদ সদস্য করার দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদন
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য মনোনয়নের প্রক্রিয়া বর্তমানে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের ভাগে থাকা ৩৬টি আসনে প্রার্থী নির্ধারণে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং স্থায়ী কমিটির সদস্যরা প্রায় এক হাজার আগ্রহী প্রার্থীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে আজকালের মধ্যেই সেই কাঙ্ক্ষিত ৩৬ জনের নাম চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় এবং পরবর্তী আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়াগুলো দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। সংসদের সাধারণ আসনে বিজয়ী দলগুলোর আনুপাতিক হারে এই সংরক্ষিত আসন বণ্টন করা হয়, যেখানে বিএনপি তাদের সংসদীয় শক্তির ভিত্তিতে ৩৬টি আসন লাভ করেছে। এই আসনগুলো কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং তৃণমূলের ত্যাগী নারী নেত্রীদের মূল্যায়ন ও আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার একটি বড় সুযোগ।
এই মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে যখন আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে মেলাই, তখন এক ভিন্ন ও জটিল বাস্তবতা সামনে আসে। রূপালী বাংলাদেশে প্রকাশিত “পার্বত্য চট্টগ্রামে কার শাসন চলে?” নিবন্ধের তথ্যমতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মোট আয়তনের ১১.১৯ শতাংশ হলেও এখানে ক্ষমতার বণ্টন চরম বৈষম্যমূলক। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৪টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনসংখ্যার অনুপাত প্রায় সমান—বাঙালি ৫১ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৪৯ শতাংশ।
অথচ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দোহাই দিয়ে আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদগুলো আইনগতভাবেই বাঙালিদের জন্য রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এখানকার তিনটি সাধারণ সংসদীয় আসনের মধ্যে ইতিমধ্যে দুটি নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের দখলে এবং বর্তমান পার্বত্য মন্ত্রীও একজন নৃগোষ্ঠীর সদস্য। এই একচেটিয়া প্রতিনিধিত্বের কারণে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক তথা ১১ লাখ বাঙালি জনগোষ্ঠীর দাবি-দাওয়া ও সমস্যাগুলো জাতীয় পর্যায়ে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে না। এই ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদী অসন্তোষ এবং সশস্ত্র তৎপরতাকে উসকে দিচ্ছে।
সংরক্ষিত আসনে বাঙালি নারী নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই 'ক্রিটিক্যাল' রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতার ভারসাম্য আনা জরুরি। যেহেতু অন্য সব শীর্ষ পদ বাঙালিদের জন্য অলিখিত বা লিখিতভাবে নিষিদ্ধ, সেহেতু সংরক্ষিত নারী আসনে একজন বাঙালি নারীকে মনোনয়ন দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, বরং পাহাড়ে বসবাসরত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকারের স্বীকৃতি।
তিন জেলার মনোনয়ন লড়াই ও প্রার্থীরা
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা—খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটি—থেকে এবার সংরক্ষিত নারী আসনে রেকর্ডসংখ্যক এক ডজন নারী নেত্রী বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। ১৮ এপ্রিল ২০২৬-এর সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি জেলা থেকে চারজন করে প্রার্থী এই লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন।
খাগড়াছড়ি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা মহিলা দলের সভাপতি কুহেলি দেওয়ান, সাধারণ সম্পাদক শাহেনা আক্তার, সাংগঠনিক সম্পাদক তাসনিম সিরাজ সীমা এবং মাটিরাঙ্গা উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি মাজেদা বেগম। বান্দরবান থেকে মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন জেলা মহিলা দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি উম্মে কুলসুম লীনা, আলীকদম উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শিরিনা আক্তার, রুমা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান উম্যাচিং মারমা এবং জেলা পরিষদের সদস্য মাধবী মারমা। রাঙামাটি থেকে লড়ছেন জেলা মহিলা দলের সভাপতি নূর জাহান পারুল, সাবেক সভাপতি মিনারা বেগম এবং ছাত্রদলের নেত্রী সায়রা চন্দ্রা চাকমা।
এঁদের মধ্যে বান্দরবানের উম্মে কুলসুম লীনা বা রাঙ্গামাটির নূর জাহান পারুল তৃণমূলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেত্রী। আবার বান্দরবানের মাধবী মারমা বা রুমা উপজেলার উম্যাচিং মারমাও উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি দলের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, পাহাড়ের বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতায় একজন উচ্চশিক্ষিত ও প্রজ্ঞাবান বাঙালি নারী নেত্রীর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
খাগড়াছড়ি তথা পার্বত্য এলাকা থেকে সংরক্ষিত আসনের প্রার্থী হিসেবে শাহেনা আক্তার বর্তমানে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন। তার প্রার্থিতা কেবল আঞ্চলিক কোটা পূরণের জন্য নয়, বরং তার যোগ্যতা ও সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত যৌক্তিক। শাহেনা আক্তারের পরিচিতি ও রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- তিনি দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। একজন উচ্চশিক্ষিত নারী হিসেবে জাতীয় সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার সক্ষমতা তার রয়েছে।
শাহেনা আক্তার কেবল ড্রয়িংরুম পলিটিশিয়ান নন, বরং খাগড়াছড়ির দুর্গম জনপদে বিএনপির আদর্শ প্রচারে তিনি রাজপথের সক্রিয় কর্মী। ছাত্রদলের রাজনীতি করে আসা শাহেনা বর্তমানে জেলা বিএনপির সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের পাশাপাশি জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক এবং নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম, খাগড়াছড়ি জেলা শাখার আহ্বায়ক। তিনি ছিলেন মাটিরাঙ্গা পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক এবং মহিলা দলের সভাপতিও। পার্বত্য চট্টগ্রামে ছাত্রদলের একমাত্র নারী ইউনিট প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আন্দোলন-সংগ্রামে তার ত্যাগ ও নিষ্ঠা দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হলে সেখানকার প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অংশীদারিত্বের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে হবে। একপক্ষকে ক্ষমতায়িত করে অন্য পক্ষকে প্রান্তিক করে রাখার নীতি অতীতে সফল হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। শাহেনা আক্তারের মতো যেমন মাঠের ত্যাগী নেত্রী রয়েছেন, তেমনি কুহেলি দেওয়ান বা উম্মে কুলসুম লীনার মতো অভিজ্ঞদের অবদানও অনস্বীকার্য। তবে দল যদি একজন শিক্ষিত, সচেতন এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী নেত্রীকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেন, তবে তা পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি পাহাড়ের বঞ্চিত মানুষের মনে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের নতুন সঞ্চার করবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক:আবছার উদ্দিন
উপ-সম্পাদক: সাইফুল ইসলাম ফাহাদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: চান্দিনা রোড,নিউ-মার্কেট,দেবিদ্বার, কুমিল্লা।
All rights reserved © 2025