শিল্প–অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় আর্থিক শাসনের গুরুত্ব: মোস্তাকুর রহমান প্রসঙ্গ
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
বাংলাদেশ যখন রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের নতুন বাস্তবতায় পথ খুঁজছে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে—প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক শাসন কতটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে? বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, পুঁজিবাজারের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন দক্ষ, নীতিনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণসমৃদ্ধ নেতৃত্ব। এই প্রেক্ষাপটে মোঃ মোস্তাকুর রহমানের মতো পেশাদারদের ভূমিকা আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ১৯৯২ সালে Institute of Cost and Management Accountants of Bangladesh থেকে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন। গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি করপোরেট অর্থব্যবস্থা, রপ্তানি অর্থনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার বিভিন্ন স্তরে কাজ করেছেন। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে কেবল একজন শিল্প উদ্যোক্তা নয়, বরং আর্থিক কাঠামো বিশ্লেষক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই খাতের নীতি ও ব্যাংকিং–সংক্রান্ত আলোচনায় Bangladesh Garment Manufacturers and Exporters Association (BGMEA)-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোস্তাকুর রহমান এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থাৎ, শিল্পখাত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যকার নীতিগত সংলাপে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। শিল্প অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও তারল্য কাঠামো নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা এখানেই বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে।
পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রেও তাঁর অভিজ্ঞতা কম নয়। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি Chittagong Stock Exchange Ltd.-এর বোর্ড সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ছিল রূপান্তরের এক সন্ধিক্ষণে। সে সময়ের নীতি ও কাঠামোগত আলোচনায় অংশ নেওয়া মানে ছিল বাজারের ভেতরের দুর্বলতা ও সম্ভাবনাকে কাছ থেকে দেখা।
তিনি Real Estate and Housing Association of Bangladesh (REHAB) এবং Dhaka Chamber of Commerce and Industry (DCCI)-এর সঙ্গেও সম্পৃক্ত থেকেছেন। ফলে শিল্প, আবাসন ও বাণিজ্য—তিনটি ভিন্ন খাতের আর্থিক বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বহুমাত্রিক।
বর্তমানে একটি রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে তিনি যে দায়িত্ব পালন করছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে করপোরেট ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং সম্পর্ক, মূলধন কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থা। শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে টেকসই অর্থায়ন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সমন্বয় যে কতটা জরুরি, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা তা আরও স্পষ্ট করেছে।
তবে এই আলোচনা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত—বাংলাদেশের শিল্পখাত কি পর্যাপ্ত আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে? মোস্তাকুর রহমানের পেশাগত জীবন সেই প্রশ্নের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা—এই তিনের সমন্বয় ছাড়া শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও তাঁর সম্পৃক্ততা লক্ষণীয়—প্যালিয়েটিভ কেয়ার, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা এবং চিকিৎসা সহায়তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ তাঁর নেতৃত্বের মানবিক দিকটি প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সেখানে নীতিনিষ্ঠ আর্থিক নেতৃত্বের বিকল্প নেই। শিল্পখাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক রাখতে হলে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শাসনের সংস্কৃতি। মোস্তাকুর রহমানের কর্মপথ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সংগঠিত আর্থিক কাঠামো ও জবাবদিহিতার চর্চাই পারে শিল্পোন্নয়নের ভিত্তিকে মজবুত করতে।
ব্যক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিই শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে—আর সেই শক্তি গড়ে ওঠে দক্ষ, সৎ ও বিশ্লেষণসমৃদ্ধ নেতৃত্বের হাত ধরে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
সম্পাদক ও প্রকাশক:আবছার উদ্দিন
উপ-সম্পাদক: সাইফুল ইসলাম ফাহাদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: চান্দিনা রোড,নিউ-মার্কেট,দেবিদ্বার, কুমিল্লা।
All rights reserved © 2025