
সাবেক প্রেস সচিবের শফিকের বিরুদ্ধে ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সদ্য বিলুপ্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া এক অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে ভাইকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে বসিয়ে তিনি প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ইতিমধ্যে দুদক এসব অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে।
এরই মধ্যে সরকার বিলুপ্তির পরপরই সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারের নতুন একটি কর্মস্থলে যোগদান নিয়ে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপের অর্থায়নে বাজারে আসতে যাওয়া ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি ওয়াদা’য় (Daily Wada) যোগ দিয়েছেন তাঁরা। সদ্য বিলুপ্ত সরকারের আমলেই এমজিএইচ গ্রুপের প্রধান নির্বাহীর শতকোটি টাকার একটি দুর্নীতি মামলা প্রত্যাহার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলমের বিরুদ্ধে দুদকে জমা পড়া অভিযোগে ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তাঁকে ‘ডাস্টবিন শফিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন স্থানে বেপরোয়া চাঁদাবাজি করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিকভাবে ব্যবসা বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগের সবচেয়ে বড় অংশটি হলো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) কেন্দ্রিক। সেখানে বলা হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে শফিকুল আলম তাঁর ভাইকে নাসিকের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসান এবং এর মাধ্যমে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেন। এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, ‘ডেইলি ওয়াদা’ নামের কোনো পত্রিকার অস্তিত্ব দেশের গণমাধ্যম জগতে আগে ছিল না। এই পত্রিকার অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপের গ্লোবাল সিইও আনিস আহমেদ গোর্কি। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেই তাঁর বিরুদ্ধে থাকা ১৩৬ কোটি টাকার একটি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের মামলা প্রত্যাহার করা হয়।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর আনিস আহমেদের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিল সংস্থাটি। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের অনুমোদনও দেওয়া হয়। ওই সময় দুদক জানিয়েছিল, আনিস আহমেদের ১৩৬ কোটি টাকার সম্পদের মধ্যে ১৭ কোটি ২২ লাখ টাকার বেশি সম্পদের কোনো বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মোহাম্মদ আশ-শামস জগলুল হোসেন মামলাটি প্রত্যাহারের আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়েছিল, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলাটি চালিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
লেখক ও বিশ্লেষক কবির য়াহমেদ সম্প্রতি এক নিবন্ধে এই নিয়োগ এবং এমজিএইচ গ্রুপের কর্ণধারের মামলা প্রত্যাহারের যোগসূত্র নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি তাঁর নিবন্ধে লিখেছেন, ‘আনিস আহমেদ গোর্কির বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহার করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই মামলা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া কি বিধিসম্মত ছিল? এর সঙ্গে কি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় জড়িত ছিল?’
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের প্রভাবশালী পদে থাকা ব্যক্তিরা দায়িত্ব ছাড়ার পরপরই এমন একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, যে প্রতিষ্ঠানটি তাঁদের মেয়াদকালেই বড় ধরনের আইনি সুবিধা পেয়েছে। একে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার বড় ধরনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন তাঁরা। মামলা প্রত্যাহারের পেছনে কোনো ‘লেনদেন’ ছিল কি না, তা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

