স্থানীয় সরকার ও নেতৃত্ব: জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক মানদণ্ড
- প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারুল সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ভিত্তি হলো স্থানীয় সরকার। তৃণমূল পর্যায়ের সুশাসন, টেকসই উন্নয়ন এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষায় স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে সমসাময়িক সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় অপরাধ বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এই স্তরের নেতৃত্ব নির্বাচনে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক, তাত্ত্বিক ও নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একজন সুযোগ্য প্রার্থীর যোগ্যতা ও গুণাবলীর রূপরেখা নিম্নরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয়:
সততা, নৈতিক শুদ্ধতা ও অপরাধমুক্ত অতীত (Integrity and Transparence)ঃ
রাজনৈতিক অপরাধ বিজ্ঞান (Political Criminology) বলে, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির উৎস অনেক সময়ই শুরু হয় তৃণমূল পর্যায় থেকে। তাই একজন প্রার্থীর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবন হতে হবে সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত ও স্বচ্ছ। লুণ্ঠনমূলক রাজনীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে যিনি আইনি ও নৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারবেন, তিনিই প্রকৃত জননেতা। প্রার্থীর অতীত রেকর্ডে কোনো ধরনের অপরাধমূলক সংশ্লেষ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত থাকলে তা সুশাসনের ধারণাকে সমূলে বিনষ্ট করে।
জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রদর্শন ও নিঃস্বার্থ মানসিকতা (Altruistic Leadership)ঃ
নেতৃত্ব কোনো সুযোগ বা বৈষয়িক লাভের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি সামাজিক চুক্তি (Social Contract)। মেকিয়াভেলিয়ান ক্ষমতার লোভ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রার্থীর মধ্যে থাকতে হবে সমাজ পরিবর্তনের একনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থ প্রত্যয়। জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রদর্শনের অনুপস্থিতিতে স্থানীয় নেতৃত্ব কেবলই একটি সুবিধাবাদী শ্রেণীতে পরিণত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে।
প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাগত সচেতনতা (Academic and Regulatory Literacy)ঃ
আধুনিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কেবল প্রথাগত সালিশ-বিচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি বরাদ্দ, বাজেট প্রণয়ন, আইনি বিধিমালা, এবং নীতি-নির্ধারণী নথিপত্র সঠিকভাবে অনুধাবন করার জন্য একজন প্রতিনিধির ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা অপরিহার্য। একজন শিক্ষায় সচেতন জনপ্রতিনিধি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন ও নাগরিক অধিকারের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অনেক বেশি সক্ষম।
টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ-অবকাঠামো জ্ঞান (Sustainable Urbanization and Infrastructure Eco-system)ঃ
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে গ্রামীণ বা নগর অবকাঠামো উন্নয়ন কেবল রাস্তাঘাট নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন দূরদর্শী প্রার্থীর আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Waste Management), বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই নগর বা গ্রামীণ অবকাঠামো বিনির্মাণের সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে। তাত্ত্বিক জ্ঞান ও প্রায়োগিক পরিকল্পনার সমন্বয় ছাড়া আধুনিক স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন রূপরেখা বাস্তবায়ন অসম্ভব।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও চব্বিশ ঘণ্টার জবাবদিহিতা (Social Accountability)ঃ
গণতান্ত্রিক সুশাসনের অন্যতম শর্ত হলো "জনগণের কাছে সার্বক্ষণিক দায়বদ্ধতা"। নির্বাচনী ইশতেহার বা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়েও সংকটে, দুর্যোগে ও জনগণের যেকোনো প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টা পাশে থাকার মানসিকতা প্রার্থীর মনস্তত্ত্বে থাকতে হবে। নাগরিকের প্রতি এই সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করার সাহসই একজন সাধারণ প্রার্থীকে অনন্য নেতায় রূপান্তরিত করে।
পরিশেষে বলা যায়, স্থানীয় সরকার কাঠামোর কার্যকারিতা নির্ভর করে নেতৃত্বের গুণগত মানের ওপর। যিনি দেশের প্রচলিত আইনের চোখে সম্পূর্ণ বৈধ ও নিষ্কলঙ্ক, শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক দিক থেকে সচেতন এবং সততা ও জনসেবার আদর্শে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গ্রহণযোগ্য— তিনিই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একজন "আদর্শ প্রার্থী" হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য। তৃণমূল পর্যায়ে এমন নেতৃত্বের উত্থানই কেবল একটি কল্যাণকামী ও অপরাধমুক্ত রাষ্ট্র বিনির্মাণকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
লেখকঃ - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারুল সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
সম্পাদক ও প্রকাশক:আবছার উদ্দিন
উপ-সম্পাদক: সাইফুল ইসলাম ফাহাদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: চান্দিনা রোড,নিউ-মার্কেট,দেবিদ্বার, কুমিল্লা।
All rights reserved © 2025