
স্বাধীন বাংলাদেশ এবং মেজর জিয়াউর রহমান
মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি অনিবার্য স্ফুলিঙ্গ। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের দিন, আর এই বিজয়ের পেছনে যে কয়জন মানুষের প্রত্যক্ষ সমরকৌশল, অসীম সাহসিকতা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত কাজ করেছে, তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান নিঃসন্দেহে সম্মুখসারির যোদ্ধা।
মার্চের ২৫ তারিখের সেই কালরাত। ঢাকা তখন মৃত্যুপুরী। চারদিকে কেবল হাহাকার, আগুন আর লাশের স্তূপ। রাজনৈতিক নেতারা অনেকেই আত্মগোপনে, কেউবা বন্দি। সাধারণ মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ঠিক কী করতে হবে, কার নির্দেশ মানতে হবে—এই চরম বিভ্রান্তির মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে একটি কণ্ঠস্বর ইথারে ভেসে এল। নিজেকে ‘মেজর জিয়া’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন এক তরুণ সেনা কর্মকর্তা।
অনেকে তাত্ত্বিক বিতর্ক জুড়ে দেন—কে আগে ঘোষণা দিল, কার অধিকার ছিল। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানের বাস্তবতা হলো, ওই সময়ে একজন সামরিক কর্মকর্তার কণ্ঠে “উই রিভোল্ট” বা “আই ডিক্লেয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্স” শব্দগুলো সাধারণ মানুষের মনে যে বিদ্যুৎলহরি তৈরি করেছিল, তা ছিল অভাবনীয়। কারণ, বাঙালি তখন একজন যোদ্ধাকে খুঁজছিল। মানুষ বুঝতে পারছিল, এটি আর মিছিল-মিটিংয়ের সময় নয়, এটি অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়ে দেওয়ার সময়। জিয়াউর রহমানের সেই ঘোষণা কেবল একটি রেডিও বার্তা ছিল না; এটি ছিল হতাশায় নিমজ্জিত জাতির জন্য একটি ‘লাইফলাইন’। গ্রামের যে কৃষকটি লাঙল ফেলে যুদ্ধে যাওয়ার কথা ভাবছিল, তার মনে হলো—আমাদের নিজস্ব একজন মেজর যখন আছেন, তখন আমরাও পারব। এই মনস্তাত্ত্বিক শক্তিটিই ছিল যুদ্ধের প্রাথমিক জ্বালানি। জিয়া জানতেন, একটি জাতি ততক্ষণ যুদ্ধ করতে পারে না যতক্ষণ না তারা বিশ্বাস করে যে তাদের জেতার সম্ভাবনা আছে। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি সেই বিশ্বাসটুকু বুনে দিয়েছিলেন। তিনি ঝুঁকি নিয়েছিলেন নিজের জীবনের। পাকিস্তান আর্মি তখন তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে, অথচ তিনি নির্ভীক চিত্তে বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন—বাংলাদেশ স্বাধীন। এই একটি ঘটনা তাকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন দিয়ে দেয়। এটি কোনো সাজানো নাটকের সংলাপ ছিল না, এটি ছিল মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনা সাহসের হুঙ্কার।
ঘোষণার পেছনের গল্পটি আরও রোমাঞ্চকর। ২৫ মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানিরা হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, জিয়া তখন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড। তার চোখের সামনে দুটি পথ ছিল। এক, পাকিস্তানি কমান্ডের নির্দেশ মেনে চুপচাপ ব্যারাকে বসে থাকা এবং সম্ভবত পরে নিজেও হত্যার শিকার হওয়া। দুই, বিদ্রোহ করা। জিয়া দ্বিতীয় পথটি বেছে নিলেন। ষোলশহরে যখন তাকে বন্দরে গিয়ে অস্ত্র খালাস করার নির্দেশ দেওয়া হলো, তিনি তখনই বুঝে ফেলেছিলেন এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে। রাস্তায় ব্যারিকেড আর মানুষের জটলা দেখে তিনি ফিরে এলেন।
সেই রাতে তিনি তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে যে বিদ্রোহ করলেন, তা ছিল রীতিমতো সিনেমার গল্পের মতো। নিজের কমান্ডিং অফিসারদের হত্যা বা বন্দি করে তিনি পুরো ব্যাটালিয়নকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিলেন। ভাবুন তো পরিস্থিতিটা! একজন মেজর, যার সামনে বিশাল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, হাতে সীমিত রসদ, অথচ তিনি তার সৈন্যদের বলছেন—আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। এই যে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, এটিই জিয়াউর রহমানকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছিল। তিনি কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং ক্ষুরধার বুদ্ধি দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করেছিলেন। তিনি জানতেন, এখনই আঘাত না করলে আর কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে না। ষোলশহরের সেই রাতে তিনি কেবল একজন বিদ্রোহী ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক নতুন বাহিনীর অধিনায়ক। তার এই বিদ্রোহের খবর যখন অন্যান্য ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছাল, তখন বাঙালি অফিসার ও সৈনিকরা বুঝতে পারলেন—প্রতিরোধ সম্ভব। সেই রাতে যদি জিয়াউর রহমান দ্বিধা করতেন, তবে হয়তো মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক প্রতিরোধ পর্বটিই ভেঙে পড়ত। তার এই ‘ক্যালকুলেটেড রিস্ক’ বা হিসেবি ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাই তাকে পরবর্তী ৯ মাসের যুদ্ধের ময়দানে টিকিয়ে রেখেছিল।
যুদ্ধ মানেই কেবল গুলি আর বোমাবাজি নয়; যুদ্ধ মানে হলো কৌশল। জিয়াউর রহমান ছিলেন পুরোদস্তুর সামরিক মস্তিষ্কের মানুষ। তিনি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব নিলেন। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যুদ্ধ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু জিয়া তার ভৌগোলিক জ্ঞান এবং সামরিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগালেন। তিনি তার বাহিনীকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে হিট-এন্ড-রান বা গেরিলা পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিলেন।
কিন্তু জিয়ার সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত ‘জেড ফোর্স’ গঠন। যুদ্ধের একটা পর্যায়ে তিনি অনুভব করলেন, কেবল বিচ্ছিন্ন গেরিলা হামলা দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে পুরোপুরি পরাস্ত করা যাবে না। প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল, নিয়মিত ব্রিগেড। তেলঢালা ক্যাম্প থেকে তিনি গড়ে তুললেন প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড—জেড ফোর্স। এটি ছিল তার নামের আদ্যক্ষর দিয়ে তৈরি। এই ফোর্স গঠন করার মধ্যে দিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন, বাঙালিরা কেবল ঝোপঝাড় থেকে গুলি ছুড়তে জানে না, তারা সামনাসামনি যুদ্ধ বা কনভেনশনাল ওয়ারফেয়ারেও দক্ষ। জেড ফোর্সের অধীনে তিনি কামালপুর, রৌমারীসহ বিভিন্ন সীমান্তে যে দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়েছেন, তা সমরবিদদের কাছে গবেষণার বিষয়। বিশেষ করে কামালপুরের যুদ্ধের কথা না বললেই নয়। সেখানে পাকিস্তানিরা দুর্ভেদ্য ঘাঁটি গেড়েছিল। জিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সেখানে আক্রমণ চালিয়েছেন। তিনি নিজে উপস্থিত থেকেছেন ফ্রন্টলাইনে। শোনা যায়, তিনি নাকি সৈনিকদের সাথে একই ট্রেঞ্চে ঘুমাতেন, একই খাবার খেতেন। এই যে সাধারণ সৈনিকের সাথে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা—এটি তাকে তার অধীনস্থদের কাছে ‘দেবতুল্য’ করে তুলেছিল। একজন কমান্ডার যখন নিজে গুলির সামনে দাঁড়ান, তখন তার অনুসারীরা মৃত্যুর ভয় পায় না। জিয়া সেই সাইকোলজিটা বুঝতেন। তিনি জানতেন, দূর থেকে নির্দেশ দিয়ে এই যুদ্ধ জেতা যাবে না। তাই তিনি বারবার মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছেন, কিন্তু পিছু হটেননি। জেড ফোর্স শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের আরেকটি বড় গুণ ছিল তার সাংগঠনিক দক্ষতা। ১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি হাজার হাজার যুবককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এদের মধ্যে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক—সব শ্রেণির মানুষ ছিল। একজন পেশাদার সৈনিকের জন্য সিভিলিয়ানদের অল্প সময়ে যোদ্ধায় রূপান্তর করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু জিয়ার ছিল অদ্ভুত এক সম্মোহনী শক্তি। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন সামনে থাকা মানুষটি নিজের ভেতরের সুপ্ত সাহস খুঁজে পেত। তিনি কড়া অনুশাসনের মধ্যে দিয়েও তাদের আপন করে নিতেন।
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই যুদ্ধ কেবল ভারতের সহায়তায় জেতা যাবে না; আমাদের নিজস্ব শক্তি বাড়াতে হবে। তাই তিনি অস্ত্র সংগ্রহের জন্য এবং আন্তর্জাতিক জনমত তৈরির জন্যও কাজ করেছেন। তবে তার মূল ফোকাস ছিল ‘ফিল্ড অ্যাকশন’। রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন নির্মম এবং আপসহীন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শত্রুকে কোনো ছাড় দেওয়া মানে নিজের মৃত্যুকে ডেকে আনা। তার রণকৌশল ছিল—আক্রমণ, আক্রমণ এবং আক্রমণ। তিনি ডিফেন্সিভ খেলার চেয়ে অফেন্সিভ খেলতে বেশি পছন্দ করতেন। সিলেটের বিভিন্ন চা বাগান এবং বর্ডার আউটপোস্ট গুলোতে তিনি যে সব অ্যামবুশ সেট করেছিলেন, তা পাকিস্তানি বাহিনীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। পাকিস্তানিরা জানত, মেজর জিয়ার এরিয়ায় ঢোকা মানেই নিশ্চিত বিপদ। এই ভীতি তৈরি করাটাও যুদ্ধের একটা বড় অংশ। শত্রুর মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতে পারলে অর্ধেক যুদ্ধ ওখানেই জেতা হয়ে যায়। জিয়াউর রহমান সেই কাজটি খুব নিপুণভাবে করেছিলেন। তার সেক্টরে তিনি এমন এক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন যে, পাকিস্তানিরা কোথায় মুভ করছে, তা তিনি আগেই জেনে যেতেন। এই গোয়েন্দা তথ্য এবং দ্রুত গতির আক্রমণের সমন্বয়ে তিনি একের পর এক এলাকা মুক্ত করেছিলেন।
১৬ ডিসেম্বর যখন আমরা বিজয় অর্জন করলাম, তখন তার পেছনে ছিল দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল ইটের গাঁথুনির মতো শক্ত। তিনি কেবল যুদ্ধই করেননি, যুদ্ধের মাঠে নেতৃত্বের সংকটও দূর করেছিলেন। অনেকে বলেন, তিনি ছিলেন যুদ্ধের মাঠে বাস্তববাদী। আবেগের বশে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত তিনি নিতেন না। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল মাপা। বিজয় দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পেছনে তাকাই, তখন দেখি ময়লা পোশাক পরা, হাতে স্টেনগান, চোখেমুখে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেজরকে।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, দেশপ্রেম মানে কেবল বড় বড় বক্তৃতা দেওয়া নয়; দেশপ্রেম মানে হলো নিজের রক্ত দিয়ে মাটির ঋণ শোধ করা। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় হয়তো কোনো একক ব্যক্তির কৃতিত্ব নয়, এটি ছিল সামষ্টিক অর্জন। কিন্তু সেই সমষ্টির মধ্যে জিয়াউর রহমান ছিলেন এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। তিনি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে শূন্য থেকে শুরু করে একটি বিশাল বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা যায়। তার অবদানকে অস্বীকার করা মানে ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায়কে ছিঁড়ে ফেলা। আজ এত বছর পরেও, যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা ওঠে, তখন জিয়ার নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সাথে। কারণ, তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি আমাদের কানে প্রথম স্বাধীনতার মন্ত্র শুনিয়েছিলেন এবং সেই মন্ত্রকে বাস্তবে রূপ দিতে নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। বিজয়ের এই দিনে তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা। তার যুদ্ধের দর্শন, তার ক্ষিপ্রতা এবং তার নেতৃত্ব আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন—পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক না কেন, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ালে বিজয় আসবেই। এই ১৬ ডিসেম্বর তাই কেবল উৎসবের দিন নয়, এটি জিয়াউর রহমানের মতো বীরদের ত্যাগের কথা স্মরণ করার দিন। তাদের রক্তে কেনা এই বাংলা, তাদের সাহসে গড়া এই মানচিত্র।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
Email : msislam.sumon@gmail.com

