নিজস্ব প্রতিবেদক:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার বাণিজ্য এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলা নানা অভিযোগের কেন্দ্রে এবার উঠে এসেছে নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলামের নাম। সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে অনিয়ম, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য এবং প্রভাব খাটিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগে তাকে ঘিরে তীব্র আলোচনা তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
বিশেষ করে শেরে বাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২, ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিক অভিযোগপত্র, ঠিকাদারদের গোপন সাক্ষ্য এবং দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্যে উঠে এসেছে ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি উন্নয়ন কাজের নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দেওয়া হতো। টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে, তা অনেকটা “নির্ধারিত” থাকতো বলেও অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজ শেষ না করেই বিল উত্তোলন এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় অনুমোদনের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হতো। একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, কাজ পেতে হলে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে বাধ্য করা হতো। কেউ কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার দরপত্র বাতিল, বিল আটকে রাখা কিংবা ভবিষ্যতে কাজ না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, “গণপূর্তে কাজ করতে গেলে একটি নির্দিষ্ট চক্রের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া টিকে থাকা কঠিন। কমিশন ছাড়া ফাইল নড়ে না। যারা নিয়ম মেনে কাজ করতে চেয়েছে, তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে।”
অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কয়েক বছরে শত শত কোটি টাকার সরকারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, যার নেতৃত্বে ছিলেন জহুরুল ইসলাম—এমন দাবিও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে জহুরুল ইসলামের বিপুল সম্পদ গড়ে ওঠার অভিযোগও উঠেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে-বেনামে জমি, ফ্ল্যাট, প্লট এবং ব্যবসায় বিনিয়োগের তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। যদিও এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খোদ গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা।
সূত্র জানায়, দায়িত্বকালীন সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও রহস্যজনক কারণে সেসব তদন্ত আলোর মুখ দেখেনি। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া ধামাচাপা দেওয়া হতো। অনেক ক্ষেত্রে তদারকি প্রতিবেদনে অনিয়ম ধরা পড়লেও পরে তা “ম্যানেজ” করার অভিযোগও রয়েছে।
দুর্নীতিবিরোধী সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ই নয়, বরং জনসাধারণের নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত স্থায়িত্বের জন্যও বড় হুমকি। নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।
এদিকে জহুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আরও বড় দুর্নীতির চিত্র সামনে আসতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক:আবছার উদ্দিন
উপ-সম্পাদক: সাইফুল ইসলাম ফাহাদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: চান্দিনা রোড,নিউ-মার্কেট,দেবিদ্বার, কুমিল্লা।
All rights reserved © 2025