
কুতুবদিয়া এক অনন্য,মমতাময়ী মায়ের ২৮/০১/২০২৫ তারিখ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।
মিসেস হাসনাত পিয়ারি:
পৃথিবীতে মানুষের জন্ম মাত্র স্বল্পকালের জন্য।কখন যে জীবনের বেলা বয়ে যায় কেউ তার খবর রাখে না,দুনিয়ার সংসারের কাজে প্রতিপত্তির মোহেপড়ে মানুষ এমন বেহুশ বেকারার হয়ে পড়ে পেছনে তাকানোর সময় পায় না।একদিন হঠাৎ আজরাইল ফেরেশতা এসে হাজির হয় ব্যক্তির শিয়রে।
দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে ও মানুষের অন্তরে গেঁথে আছে যার নাম,
তিনিই আমাদেরই আম্মাজান মরহুমা মনছুরা খানম।
প্রারম্ভিক:
কালামে পাকে এরশাদ হয়েছে:
يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ
“তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে হিকমা তথা দ্বীনের ইলম দান করেন। আর যাকেই এই হিকমাত দান করা হয়েছে তাকে অতীব কল্যাণের অধিকারী করা হয়েছে, আর জ্ঞান বানরাই শিক্ষা গ্রহণ করেন।” (সুরা বাকারাহ:২৬৯)
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- থেকে বর্ণিত :
من يرد الله به خيرا يفقهه في الدين.
আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করেন।
শরীয়ত ও তরিকতের অতি উচ্চ মর্যাদার প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছিল দিন ইসলামের খেদমতের মধ্য দিয়ে। ওনার জীবন বৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা সম্ভব না হলে ও যেটুকু সম্ভব নিম্নে সংক্ষিপ্ত আকারে পেশ করার চেষ্টা করছি।
জন্ম ও বংশ পরিচয়:
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে আলোকিত দ্বীপকূল কুতুবদিয়া থানায় অবস্থিত দক্ষিণ ধুরুংয়ের শ্রেষ্ঠ ও সম্ভ্রান্ত পরিবার হাফেজ শামসুদ্দিন( রা:) এর বড় ছেলে মরহুম হাফেজ মৌলানা আব্দুল খালেকের বড় পু্ত্র ও অলিকুল শিরোমনি শাহ আব্দুল মালেক মহিউদ্দিন আল কুতুবী (রা:) এর বড় ভাতিজা মরহুম মৌলানা ছলিম উদ্দিনের প্রথমা কন্যা অর্থাৎ আমার শ্রদ্ধেয় আম্মাজান ১৯৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মাতার নাম তাহেরা বেগম। ওনি ৬০ বছর বয়সে গত বছরের ২৮ জানুয়ারী, রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে আমার আম্মা মনছুরা খানম দুনিয়ার সফর শেষে চলে গেলেন প্রিয় প্রভুর সান্নিধ্যে ।আম্মা এ সময়ে চকরিয়া বহদ্দারকাটা নানুর বাড়ি ছিলেন আম্মার চলে যাওয়া যেন আমাদের মাথার উপর থেকে মমতাময়ী ছায়া সরে যাওয়া । যে মমতার পরশে আমরা সবসময়ই সুখে দুঃখে পাশে থাকতাম এটাই হারিয়ে ফেললাম।
গত ২০২৩ সালের কুরবানির ঈদে আম্মার সাথে শেষ দেখা হয়েছিল তখনো বুঝতে পারিনি এটাই হবে ওনার সাথে আমার শেষ সাক্ষাত। আমাকে দেখে শিশু সুলভ সরলতায় অভিযোগ ও আনন্দ মিশ্রিত সুরে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন- এত দিন পরে কেন মা? মা আমাদের ভাই বোন দুইজনকে খুবই ভালোবাসতেন, সেটা বলার মতো না।
ছোটবেলা থেকেই আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল ভিন্ন ,
আমরা ছোট বেলা থেকেই নানুর বাড়িতে বড় হয়েছি, কারণ আম্মু সবসময়ই অসুস্থ থাকত।
মায়ের জিন্দেগী কাটিয়েছেন অনেক কষ্টে, অসুস্থতার সাথে লড়াই করে। আবার শেষ বয়সে এসে মরণব্যাধি রোগ ডায়াবেটিস থেকে রক্ষা হলনা।
আমার নানাভাই বেঁচে থাকাকালীন সময়ে আমার আম্মুকে খুব বকাঝকা করত হাঁটেনা বলে, সত্যি মা কিছুই বলতনা, এমনি একটু নরম স্বরে বলে উঠতেন আব্বা আমি ভাল আছি,
আমার নানার প্রথমা কন্যা হিসেবে খুবই আদরে আদরে দিন কাটিয়েছেন আমার মা।
ছেলে মেয়েদের বাসায় গেলে দুইমাস ও থাকতেন না, তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য অস্হির হয়ে যেতেন।বেশী জোর করলে বলত আমি থাকবনা, আমার মায়ের জিন্দেগীটা কাটিয়েছেন এভাবে ছোট মাসুম বাচ্চার মত,
কোনদিন একটা পেচিয়ে কথা বলতে পারেনি,কেউ বললেও সেটা বুঝতনা।খুবই সহজ সরল মনের অধিকারী ছিলেন।
কখনো প্রতিবাদ করেনি জীবনে। খুবই শান্ত মনের ছিল, এককথায় অসাধারণ।
নানার মৃত্যুর দেড় বছরের মধ্যে আমার আম্মার মৃত্যু হয়, আল্লাহ আমার আম্মাকে নিয়ে গেলেন না ফেরার দেশে।
নানার মৃত্যু পরে মা সবসময়
আমাকে ফোনে বলত আমার আব্বা কেন চলে গেল আমাকে ফেলে, আমাকেও নিয়ে গেলে ভালো হত। মানি আমার নানার চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারতনা।
তখন আমি বলতাম তাহলে আমরা মা বলে কারে ডাকব!!তখন একটা মুচকি হাসি দিতেন।
সেদিন শেষ বারে গিয়েও মায়ের চির চেনা বৈশিষ্ট্য -খুব পরিপাটি দেখলাম। কতইনা হাসি খুশি দিন কাটত আমার মায়ের।
মারা যাওয়ার দুইদিন আগে ও কথা বললাম মা কেমন আছেন ? মা হাসিমুখে জবাব দিলেন আলহামদুলিল্লাহ্!
তোমরা কেমন আছো? তাসলিয়া ও তানকিয়া কেমন আছে? আমার সাথে কথা শেষ করে তাসলিয়ার সাথে কথা বললেন””” নানুমনি কেমন আছ “”এটাই যে শেষ কথা জানতাম না।
আরো জানালেন মায়ের অসুস্থতা একটু ডায়রিয়া একটু দুর্বলতা, ঔষধপত্র খাচ্ছে ঠিকমতো,
বাল্যকালে বিভিন্ন রকমের নামকরা ভালো প্রতিষ্ঠানে লেখা পড়া করেছেন,এমনকি দেশের বাহিরে পাকিস্তান করাচিতে ও পড়াশোনা করেছেন ।আমার নানাজান অনেক বছর করাচিতে বসবাস করেন। তখন আমার আম্মা আর মেজ খালা দুজনেই একটা নামকরা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন। ঐ মাদ্রাসায় মাঝে মধ্যে বড় বড় প্রোগ্রাম হলে ওখানে আমার আম্মা অংশগ্রহন করতেন,এবং কোরআন তেলাওয়াত, উর্দু শের অনেক কিছুতে অবিশ্বাস্য প্রথম পুরষ্কার গ্রহণ করতেন আলহামদুলিল্লাহ।
আবার বাংলাদেশে আসলে ও আমার নানা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করার জন্য নিয়ে যেতেন আর ওখানে ও কুরআন তেলাওয়াত আর বিভিন্ন নাতে সব সময়ই প্রথম পুরষ্কার গ্রহণ করতেন।
আমার আম্মার কন্ঠস্বর অনেক সুন্দর ছিল বলতে গেলে অতুলনীয়।
মায়ের মেধা ছিল অত্যন্ত প্রখর। বাংলা, আরবী,উর্দু,ও ফারসি বিভিন্ন ভাষায় শের জানতেন, মাঝে মধ্যে আমাদেরকে ও শুনাতেন। তারপর থেকে উনি নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত মেইনটেইন করতেন। এ বয়সে আম্মার মেধা শক্তি দেখে অনেকটাই অবাক হয়েছিলাম! মায়ের মত এত পরিচ্ছন্ন ,স্মার্ট ও ভারসাম্যপূর্ন সাদা মনের মানুষ পৃথিবীতে বিরল।
বাড়িতে গেলে পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন রকমের -তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের এমন বহু গল্প শোনাতেন! আজ ও মায়ের সাথে স্মৃতিগুলো স্মরন করে দু চোখে বেদনার অশ্রু ঝরে,শেষ সময়ে আরো সঙ্গ চেয়েছিলাম আম্মার! সময়ের অভাবে তা পূরন হলোনা।
শেষবারের মতো আমার বাসায় আসতে চেয়েছিল, আমি আনার জন্য একটা নতুন বাসা কনফার্ম করলাম, যেদিন কনফার্ম করে বাসায় গেলাম ঐদিনে মায়ের মৃত্যুর সংবাদ পেলাম আর আশা পূরণ হলনা, এটা আমার হৃদয়ে বার বার আঘাত করে।
সত্যি আমাদেরকে ফেলে চলে যাবে তাই শেষবারের মতো আসতে চেয়েছিল মনে হয়?
এখন অনেক প্রশ্ন জাগে মনে, শান্তনা দেওয়ার ভাষা খোঁজে পাইনা।
সংসারের সবচেয়ে দুঃখী মানুষটার নাম”মা”পৃথিবীর বুকে আসার আগেই যাকে কষ্ট দিতে থাকি। জন্মের পরেও তিনি কেবল সন্তান লালন পালনে ব্যস্ত। কোনদিন কেউ মায়ের ঋণ শোধ করতে পারেনা।
মা তো তিনি, যিনি খেটে যান শুধু সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের সুখ বিসর্জন দেন। বছরের পর বছর সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করার জন্য ব্যস্ত থাকেন।
শখের জিনিসটা নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখে তুলে দেন। পৃথিবীর সব মমতার কাছে হার মেনে যায় আমার মায়ের মমতা। প্রাণপণে যেই সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে নিজের স্বপ্নকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেন। মায়ের রক্ত মাংস চুষে আমরা বড় হই। কিন্তু তারপর??
মা সন্তানের দিকে তাকিয়ে দেখে এই তো ছেলেটা মানুষ হলেই হলো।
ছেলেটাকে বা মেয়েটাকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল। একদিন তারা পৃথিবীটা নতুন করে সাজাবে এই ছেলে বা মেয়ে।
দূর আকাশের চাঁদটা সবার জন্যই উদিত হয়। কারো কারো আকাশে মেঘের আড়ালে ঢেকে যায় পূর্ণিমা চাঁদ। আর কারো আকাশে জোৎনার আলোতে হাসে বিশ্ব।
প্রতিটা ছেলে বা মেয়েই মায়ের কোলে জন্ম নেয় চাঁদের মত হয়ে। কিন্তু সব ছেলে বা মেয়েরা জন্মদাত্রী মায়েরা সন্তানের যত্ন পায়না। সন্তানটা জোৎনা আলোকে মেঘের আড়াল করে দেয়। আর মায়ের পৃথিবীতে নেমে আসে অমাবস্যার রাত।
অথচ একদিন এই মা তাঁকে জগত দেখিয়েছে। মা তো তিনি। যাকে জন্ম দেন তাকে অভিশাপ দেয় না। আমরা বদলাই’মা’ বদলায় না। আর কোন কোন ছেলে বা মেয়ে সেই খোলা আকাশের চাঁদ হয়ে মায়ের পৃথিবীকে আলোকিত করে। মা তখন বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। প্রতিটি মা চায় তার সন্তানেরা সৎপথে থাকুক। নিজেদের স্বপ্ন ত্যাগ করে সন্তানকে গড়ে তুলতে ব্যস্ত থাকেন,আমরা ভুলে যাই মায়ের শিক্ষা।
পৃথিবীতে যার মা নাই সে বুঝতে পারে তার পৃথিবীটা কত নিষ্ঠুর। সে টের পায় জীবনটা কেমন। পৃথিবীর সকল মায়েরা ভালো থাকুক আকাশের উপরে অথবা আকাশের নিচে,যে খানেই থাকুক ভালো থাকুক।
আমার আম্মার রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।আমরা স্বাক্ষ্য দিচ্ছি , আমার আম্মা তার যৌবনের সোনালী সময়ের পুরোটাই জীবন কাটিয়েছেন অনেক কষ্টে,শুধু দুইটা সন্তানের দিকে তাকিয়ে দিন পার করেছেন।
নিশ্চয়ই তাকে প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল করবেন, আর বলবেন-হে প্রশান্ত আত্মা!
তুমি ফিরে এসো তোমার রবের প্রতি সন্তুুষ্টচিত্তে, সন্তোষ ভাজন হয়ে।অতঃপর আমার বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও। আর আমার জান্নাতে প্ৰবেশ কর।
মহান আল্লাহ আমার আম্মার সকল ভালো কাজ কবুল করে তাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদায় দাখিল করুন, আমিন।

