
সংখ্যার কাছে দায়বদ্ধতা—মোস্তাকুর রহমানকে ঘিরে বিতর্ক, আর বাংলাদেশের অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতা
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে ঘিরে বিতর্ক পৃথিবীর কোনো নতুন ঘটনা নয়। ইতিহাস খুলে দেখলে বোঝা যায়, প্রায় সব দেশেই যখনই কোনো নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত অতীত, ব্যবসায়িক সম্পর্ক কিংবা আর্থিক অবস্থাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ওঠে। কারণ বিষয়টি শুধু একটি পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্নায়ুকেন্দ্র। সুদের হার কোথায় থাকবে, মুদ্রাস্ফীতি কতটা বাড়বে বা কমবে, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা থাকবে কি না—এসব সিদ্ধান্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতি, বাজারের আস্থা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার হিসাব। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কও সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই অংশ।
প্রশ্নটি সরাসরি—তিনি কি একজন ঋণখেলাপি? কিন্তু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে যে অর্থনৈতিক পটভূমি সামনে আসে, তা অনেক বেশি জটিল এবং অনেক বেশি বাস্তব।
বিশ্ব অর্থনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, গত পাঁচ বছর ছিল এক অস্বাভাবিক সময়। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্ব বাণিজ্যকে প্রায় থামিয়ে দিয়েছিল। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী সেই বছর বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহ প্রায় ৫.৩ শতাংশ কমে যায়। শিল্প উৎপাদন কমে, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার বাতিল হতে থাকে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের মতো ভোক্তা নির্ভর খাতে এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত তীব্র। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত তখন প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিলের মুখে পড়ে বলে শিল্প সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে। এই সংকট কাটতে না কাটতেই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যুদ্ধের ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, ইউরোপের অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়ে, আর ভোক্তা বাজারে চাহিদা কমতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব বলছে ২০২২ সালে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৮.৭ শতাংশে পৌঁছায়, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম উচ্চ মাত্রা।
এই বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে দাঁড়িয়ে হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের মতো একটি রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাকে বিচার করতে হলে বাস্তবতা থেকে চোখ সরানো যাবে না। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালে উৎপাদন শুরু করে, আধুনিক জার্মান STOLL অটোমেটিক জ্যাকোয়ার্ড মেশিন দিয়ে। এটি একটি LEED Gold সার্টিফায়েড শিল্প স্থাপনা—অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন শুরু হওয়ার এক বছরের মধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে। যে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের সোয়েটার রপ্তানি যায়, সেই বাজারেই খুচরা বিক্রি কমে যায়। অর্ডার বাতিল হয়, নতুন অর্ডার আসে না, অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তাদের উৎপাদন পরিকল্পনা কমিয়ে দেয়। এই অবস্থায় বিশ্বের অসংখ্য পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বহু কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
এই পটভূমিতে হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের একটি তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্স স্কিমের আওতায় নেওয়া ৩১৮ মিলিয়ন টাকার গ্রিন ফাইন্যান্স ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি যন্ত্রপাতি কেনার জন্য নেওয়া টার্ম লোনের ৫০৩ মিলিয়ন টাকাও ফেরত দিয়েছে। অর্থাৎ মোট প্রায় ৮২১ মিলিয়ন টাকা পরিশোধের ইতিহাস রয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি পরিষ্কার বার্তা দেয়—প্রতিষ্ঠানটি ঋণ পরিশোধের দায় এড়িয়ে যায়নি। বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কার মধ্যেও আর্থিক দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছে। একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি সত্যিকারের ঋণখেলাপি হতো, তাহলে এই ধরনের বড় অঙ্কের পরিশোধের ইতিহাস তৈরি করা সম্ভব হতো না।
আরেকটি বিষয় প্রায়ই ইচ্ছাকৃতভাবে আড়ালে রাখা হয়। হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডে মো. মোস্তাকুর রহমানের মালিকানা মাত্র ২৩ শতাংশ। বাকি ৭৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে SINAMM Engineering Limited এবং অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের কাছে। করপোরেট কাঠামোয় এটি একটি স্বাভাবিক বিনিয়োগ বিন্যাস। একটি কোম্পানির আর্থিক দায় পুরোপুরি একজন শেয়ারহোল্ডারের ব্যক্তিগত দায় হয়ে যায় না, বিশেষ করে যখন তিনি সংখ্যালঘু অংশীদার। আন্তর্জাতিক ব্যবসা ব্যবস্থায় এটি খুব পরিচিত বিষয়। বিশ্বের বহু বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিভাজন আরও জটিল হয়। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনর্গঠনকে সরাসরি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত খেলাপি পরিচয় হিসেবে তুলে ধরা অর্থনৈতিক যুক্তির সঙ্গে মেলে না।
ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনও অনেক সময় ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এটি একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া। অর্থনৈতিক মন্দা বা অস্থিরতার সময় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য অনেক দেশেই এই সুযোগ দেওয়া হয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং এশিয়ার বহু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক করপোরেট ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষ নীতি চালু করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র তখন প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—শিল্প প্রতিষ্ঠান যেন হঠাৎ বন্ধ হয়ে না যায় এবং কর্মসংস্থান ভেঙে না পড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই প্রশ্নটি আরও সংবেদনশীল। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। একটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু উদ্যোক্তার ক্ষতি হয় না; হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সেই কারণে অনেক সময় ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক শিল্প প্রতিষ্ঠানকে সময় দেয়, যাতে তারা ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধ করতে পারে এবং উৎপাদন চালু রাখতে পারে।
এই জায়গায় হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের আরেকটি দিক উল্লেখযোগ্য। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও কারখানাটি একদিনের জন্যও উৎপাদন বন্ধ করেনি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝড়ের মধ্যে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি উৎপাদন ধরে রাখতে পারে, সেটি কেবল ব্যবসায়িক দক্ষতার নয়; সামাজিক দায়বদ্ধতারও প্রমাণ। কারণ এর অর্থ হলো শ্রমিকদের কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখা। বাংলাদেশের মতো শ্রমঘন অর্থনীতিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জনাব মোস্তাকুর রহমানকে নিয়ে বিতর্কের আরেকটি দিক আছে, যা অনেক সময় আলোচনায় আসে না। তিনি একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দীর্ঘদিন রপ্তানি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই অভিজ্ঞতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। কারণ ব্যাংকিং নীতি কেবল বইয়ের সূত্র দিয়ে পরিচালিত হয় না; বাস্তব বাজারের অভিজ্ঞতাও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প উদ্যোক্তারা জানেন সুদের হার কীভাবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা কীভাবে রপ্তানিকে প্রভাবিত করে, আর ব্যাংক ঋণের শর্ত কীভাবে উৎপাদনকে ধীর বা দ্রুত করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সেখানে এই বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশের গড় মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ছিল। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় কমেছে এবং আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বকে একদিকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে উৎপাদন ও বিনিয়োগকে সচল রাখতে হবে। এটি এমন এক সমীকরণ যেখানে কেবল তাত্ত্বিক অর্থনীতি নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন।
এই কারণেই মোস্তাকুর রহমানকে ঘিরে বিতর্ককে অনেকেই অন্যভাবে দেখছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, একজন উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে “ঋণখেলাপি” শব্দটি ব্যবহার করার আগে তার পূর্ণ আর্থিক ইতিহাস দেখা উচিত। যদি তিনি শত শত কোটি টাকার ঋণ পরিশোধের রেকর্ড রাখেন, নিয়মিত সুদ পরিশোধ করেন এবং কেবল নীতিগত সুযোগ অনুযায়ী ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেন, তাহলে তাকে সরাসরি খেলাপি বলা বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না।
অর্থনীতির ইতিহাসে একটি পুরোনো সত্য আছে—সংখ্যা কখনো মিথ্যা বলে না, কিন্তু সংখ্যাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। মোস্তাকুর রহমানকে ঘিরে বিতর্কের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা কাজ করছে। যদি তাঁর আর্থিক ইতিহাস খুঁটিয়ে দেখা হয়, তাহলে বোঝা যায় তিনি একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের অংশীদার, যেটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও উৎপাদন চালু রেখেছে এবং বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করেছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি একটি জায়গায় এসে দাঁড়ায়—বিশ্বাস। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে ঘিরে আস্থা তৈরি করা জরুরি। সেই আস্থা গড়ে ওঠে তথ্য, হিসাব এবং স্বচ্ছতার ওপর। যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তার জবাব দিতে হবে নথি দিয়ে। আর যদি তথ্য বলে যে অভিযোগটি অতিরঞ্জিত, তাহলে সেই সত্যও পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন। কারণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু গুজব। গুজব বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করে।
বাংলাদেশ এখন এক কঠিন অর্থনৈতিক সময় পার করছে। এই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে অযথা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা দেশের অর্থনীতির জন্য উপকারী নয়। বরং প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা। সেই আলোচনায় যদি দেখা যায় মোস্তাকুর রহমান একজন উদ্যোক্তা হিসেবে বৈশ্বিক ঝড়ের মধ্যে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রেখেছেন এবং ঋণ পরিশোধের ইতিহাস তৈরি করেছেন, তাহলে তাঁকে “ঋণখেলাপি” আখ্যা দেওয়ার আগে নতুন করে ভাবা দরকার।
অর্থনীতির ভাষায় শেষ কথা সব সময় সংখ্যাই বলে। আর সংখ্যার খাতায় যদি দায়বদ্ধতার ইতিহাস লেখা থাকে, তাহলে সেই ইতিহাসই শেষ পর্যন্ত সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com

