
স্তুতির রাজনীতির অবসান ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রথম শর্ত হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাতন্ত্র্য রক্ষা এবং স্তুতির রাজনীতির অবসান ঘটানো। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা যেভাবে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতান্ত্রিক বলয়ে বন্দি হয়েছিল, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফ্যাসিবাদী প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’-এর এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ। বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ এবং শাসন বিভাগকে কুক্ষিগত করে, এমনকি উচ্চ আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে যেভাবে জননেতা জনাব তারেক রহমানকে সুদূর প্রবাসে নির্বাসিত এবং তাঁর কণ্ঠস্বরকে মিডিয়াতে অবরুদ্ধ করার ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড ব্লুপ্রিন্ট’ বা সূক্ষ্ম নীলনকশা সাজানো হয়েছিল, তা ছিল সমকালীন ইতিহাসের এক চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম এবং চব্বিশের রক্তঝরা জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব বিপ্লব সেই ফ্যাসিবাদী কাঠামোর পতন ঘটিয়েছে।
নির্বাসন ও নানামুখী ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে জনগণের রাজনৈতিক স্পন্দন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান যখন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তিনি একটি সুনির্দিষ্ট প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন— “I have a plan” (আমার একটি পরিকল্পনা আছে)। তৎকালীন সময়ে সমালোচকদের সংশয় থাকলেও, আজ রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফার আলোকে তাঁর একেকটি জনমুখী ও দূরদর্শী পরিকল্পনা যখন বাস্তবায়িত হচ্ছে, তখন দেশবাসী এক নতুন এবং আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কিংবা ‘কৃষি কার্ড’-এর মতো কল্যাণমুখী ধারণার সফল প্রয়োগের পর, সম্প্রতি তিনি যে যুগান্তকারী প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা চাটুকারিতার সংস্কৃতিতে চূড়ান্ত আঘাত হেনেছে।
আত্ম-প্রচারণার রাজনীতি ও চাটুকারিতার অপরাধতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) দৃষ্টিতে, কোনো রাষ্ট্রে যখন ‘ব্যক্তিস্বার্থ’ ও ‘নেতৃত্বের স্তুতি’ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন সেখানে ‘প্রশাসনিক অপরাধ’ বা Administrative Deviance বৃদ্ধি পায়। রাজনৈতিক দল বা সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের ছবি ব্যবহার করে আত্ম-প্রচারণার যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছিল, তা মূলত একটি চাটুকারক ও সুবিধাবাদী শ্রেণির জন্ম দিয়েছিল। এই সংস্কৃতিতে মেধা, যোগ্যতা এবং সততার চেয়ে ‘নেতার প্রতি আনুগত্যের চাক্ষুষ প্রদর্শন’ প্রমোশন ও অবৈধ সুবিধা পাওয়ার প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর ফলে:
মেধার অবমূল্যায়ন: যোগ্য ও পেশাদার আমলারা পেছনে পড়ে যেতেন এবং সুবিধাবাদীরা প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলো দখল করতো।
পুঁজি ও রাজনীতির অশুভ আঁতাত: কালো টাকার মালিক এবং অপব্যবসায়ীরা স্থানীয় রাজনীতিতে বিশালাকার ব্যানার-ফেস্টুন ও বিলবোর্ডের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জাহির করে প্রকৃত ও ত্যাগী রাজনীতিকদের হটিয়ে দিতো।
রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়: সরকারি কর্মসূচিতে আত্ম-প্রচারণামূলক সজ্জার পেছনে বিপুল পরিমাণ জনগণের ট্যাক্সের টাকা অপচয় হতো।
ছবি প্রদর্শন নিষিদ্ধকরণ: একটি যুগান্তকারী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
গত রবিবার সচিবালয়ে যাওয়ার পথে সরকারি ব্যানার ও ফেস্টুনে নিজের ছবি দেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান যে তাৎক্ষণিক ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সরকারি কোনো কর্মসূচিতে, ব্যানারে, ফেস্টুনে বা বিলবোর্ডে (থ্রি-ডি কিংবা অন্য যেকোনো আঙ্গিকে) প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে যে পরিপত্র জারি করা হয়েছে, তা কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক দর্শন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন— “রাষ্ট্রে কোনো স্তুতি চলবে না, রাষ্ট্র চলবে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের শতভাগ প্রফেশনাল হতে হবে।”
এই ঐতিহাসিক নির্দেশনার মাধ্যমে মূলত কয়েকটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য অর্জিত হবে:
১. মেধাতন্ত্র বা Meritocracy-র পুনঃপ্রতিষ্ঠা: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি বা মূল্যায়ন এখন আর কোনো নেতার ছবি টাঙানো বা স্তুতির ওপর নির্ভর করবে না; বরং তা নির্ধারিত হবে সম্পূর্ণ যোগ্যতা, সততা এবং পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে। ২. সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস: স্থানীয় রাজনীতি ও প্রশাসনে যারা ছবি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের আখের গোছাতো, এই সিদ্ধান্তের ফলে তাদের সেই অবৈধ প্রভাব বলয় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ৩. আর্থিক সাশ্রয় ও জনকল্যাণ: ব্যানার-বিলবোর্ডের পেছনে যে বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় হতো, তা এখন থেকে সরাসরি জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—সেখানে ব্যক্তি কখনো আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং রাষ্ট্রপ্রধান নিজেকে জনগণের সেবক মনে করেন, শাসক নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান তাঁর এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি ক্ষমতার অপসংস্কৃতি বদলে দিতে বদ্ধপরিকর। চাটুকারিতা ও স্তুতির রাজনীতি বন্ধের এই পরিপত্র সুবিধাবাদী ও চাটুকারদের জন্য এক চরম দুঃসংবাদ হলেও, সাধারণ মানুষ এবং প্রকৃত রাজনীতিকদের জন্য এটি একটি সুস্থ ও আধুনিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির শুভ সূচনা। এই মেটিকুলাস প্ল্যানের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছাবে—ইনশাল্লাহ।
লেখকঃ প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।

