রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন
Headline
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইকবাল হোসাইন।উদ্বোধন করেন মশক নিধন। ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আক্রমণের প্রতিবাদে ‘বাসদ’ কর্তৃক মশাল মিছিল ও সমাবেশ ঢাকার গুলিস্তানে নরসিংদীর এক যুবকের কাঁটা দুই হাত উদ্ধার সরকারি গাছ কাটার অভিযোগ জাজিরা গার্লস স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা সুফিয়া আক্তারের বিরুদ্ধে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন গভর্নরের ১১ দফা কর্মপরিকল্পনা: স্থিতিশীলতা থেকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির পথে চিকিৎসার কেন্দ্র নয়, ময়লার স্তূপে পরিণত লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল নরসিংদীর মাধবদীতে ধর্ষণের বিচার চাইতে গেলে বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কিশোরী আমেনা বেগমকে গনধর্ষণের পর হত্যা চট্টগ্রাম সমিতি(CSN) নারায়ণগঞ্জের এর উদ্যোগে ইফতার ও দোয়া মাহফিল রমজানের জরুরী আহবান ” -আল্লামা ইমাম হায়াত শোক সংবাদঃ
Headline
Wellcome to our website...
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন গভর্নরের ১১ দফা কর্মপরিকল্পনা: স্থিতিশীলতা থেকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির পথে
/ ১১৪ Time View
Update : শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ৫:১৪ পূর্বাহ্ন

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন গভর্নরের ১১ দফা কর্মপরিকল্পনা: স্থিতিশীলতা থেকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির পথে

মো. সহিদুল ইসলাম সুমন

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ, বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থর গতি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা এবং ব্যাংকিং খাতের আস্থাহীনতা—এই চারটি উপাদান গত কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক গতিপথকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে Bangladesh Bank–এর নবনিযুক্ত গভর্নর Md. Mostaqur Rahman দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই যে ১১ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, তা কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; বরং একটি নীতিগত অবস্থান, যা অর্থনীতিকে ‘লো-লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম’ অবস্থা থেকে উত্তরণের রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

গভর্নরের বক্তব্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো স্থিতিশীলতাকে প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করা। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বলতে বোঝায় মূল্যস্তরের নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় পূর্বানুমানযোগ্যতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের গ্রহণযোগ্য পর্যায় এবং রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বিত ভারসাম্য। বিগত অন্তর্বর্তী সময়ে কঠোর মুদ্রানীতি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার মাধ্যমে যে আংশিক স্থিতি ফিরে এসেছে, সেটিকে ভেঙে না দিয়ে তার ওপর প্রবৃদ্ধির কাঠামো নির্মাণের সংকল্পই এই কর্মপরিকল্পনার প্রথম স্তম্ভ। অর্থনৈতিক ইতিহাস বলে, অস্থিরতার ভেতর প্রবৃদ্ধি কৃত্রিমভাবে ত্বরান্বিত করলে তা দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে গভর্নরের সতর্কতা বাস্তবসম্মত।
তবে স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে প্রবৃদ্ধির প্রশ্নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কেবল পরিসংখ্যানগত জিডিপি বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কথা বলেছেন। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে উচ্চ হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি সবসময় সমানতালে বাড়েনি। শ্রমঘন শিল্প, এসএমই খাত, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সেবা খাতে ঋণপ্রবাহ ও নীতিগত সহায়তা বাড়ানো হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি ইতিবাচক সংযোগ তৈরি হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিফাইন্যান্স স্কিম, ক্রেডিট গ্যারান্টি কাঠামো এবং লক্ষ্যভিত্তিক ঋণপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এখানে একটি সতর্কতা জরুরি—উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে গিয়ে যেন অকার্যকর প্রকল্পে সম্পদ আটকে না যায়, তা নিশ্চিত করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় দায়িত্ব।

বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উচ্চ সুদের হার, ডলার সংকট, কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি এবং চাহিদা হ্রাস—এই সব কারণ মিলিয়ে বহু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন স্থগিত বা সীমিত করেছে। ঋণ পুনঃতফসিল, সুদে আংশিক ছাড় কিংবা বিশেষ পুনরুদ্ধার তহবিল গঠনের উদ্যোগ শিল্প উৎপাদনকে পুনরায় সচল করতে সহায়ক হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, পুনঃতফসিল নীতির অপব্যবহার হলে তা ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ সৃষ্টি করে এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে। ফলে এই কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে কঠোর যোগ্যতা যাচাই, সময়সীমা নির্ধারণ এবং কার্যকর তদারকির ওপর।

উচ্চ সুদের হার পর্যালোচনার ঘোষণা নিঃসন্দেহে ব্যবসায়িক মহলে স্বস্তির বার্তা দেবে। কিন্তু সুদের হার কেবল প্রশাসনিকভাবে কমানো যায় না; তা নির্ধারিত হয় মুদ্রাস্ফীতি প্রত্যাশা, তারল্য অবস্থা এবং ঝুঁকি প্রিমিয়ামের ওপর। যদি মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণ অঙ্কের কাছাকাছি অবস্থান করে, তবে নীতিগত সুদ কমালে বাস্তব সুদের হার নেতিবাচক হয়ে সঞ্চয় নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াতে পারে। তাই গভর্নরের যে সতর্কতা—ঋণপ্রবাহ ও মূল্যস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য—তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি বিশ্বাসযোগ্য ডিসইনফ্লেশন পথনকশা ছাড়া টেকসইভাবে সুদের হার কমানো সম্ভব নয়।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির পৃথক বিশ্লেষণ, প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনা এবং তারল্য নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি উপাদান একত্রে কাজ না করলে মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল করা কঠিন। বাংলাদেশে সরবরাহপক্ষীয় ঝাঁকুনি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন মূল্যস্তরে প্রভাব ফেলে। ফলে মুদ্রানীতির পাশাপাশি আর্থিক ও বাণিজ্য নীতির সমন্বয় অপরিহার্য। এখানেই আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয়ের প্রশ্নটি সামনে আসে।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিতকরণের প্রতিশ্রুতি সম্ভবত এই কর্মপরিকল্পনার সবচেয়ে কাঠামোগত অংশ। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ শ্রেণিকরণে শিথিলতা, প্রভাবনির্ভর ঋণ অনুমোদন এবং তদারকির দুর্বলতা ব্যাংকিং ব্যবস্থার আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, সমান নীতি প্রয়োগ এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক সংকেত। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ মোকাবিলা করার সক্ষমতা বড় পরীক্ষা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন কার্যকরভাবে বজায় রাখা না গেলে এই সংস্কার স্থায়ী রূপ পাবে না।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রসঙ্গে গভর্নরের দৃষ্টিভঙ্গি প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘ ফাইলপ্রক্রিয়া ও অনুমোদনের জটিলতা ব্যবসায়িক পরিবেশকে ধীর করে দেয়। কিন্তু বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে জবাবদিহিতা কাঠামো শক্তিশালী না হলে সিদ্ধান্তের বৈচিত্র্য নীতিগত অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষা ও রিপোর্টিং ব্যবস্থাকে সমান্তরালভাবে শক্তিশালী করা অপরিহার্য।

অর্থ মন্ত্রণালয়, National Board of Revenue এবং Planning Commission–এর সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের অঙ্গীকার অর্থনৈতিক নীতির সামগ্রিকতা নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশে রাজস্ব ঘাটতি, উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ এবং ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা মুদ্রানীতিকে জটিল করে তোলে। যদি রাজস্ব আহরণ দক্ষ হয় এবং উন্নয়ন ব্যয় অগ্রাধিকারভিত্তিক হয়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত তারল্য জোগানের চাপ কমবে। সমন্বিত নীতিপ্রণয়নই সামষ্টিক ভারসাম্যের মূল চাবিকাঠি।

সবশেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবমূর্তি ও আস্থা পুনর্গঠনের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা, বৈদেশিক বিনিয়োগকারী এবং রেটিং এজেন্সিগুলোর কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক। স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ, সময়মতো প্রতিবেদন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা এই বিশ্বাস পুনর্গঠনে সহায়ক হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি-সংকেত যদি স্পষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য হয়, তবে বাজারের অস্থিরতা কমে এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত সহজ হয়।

সামগ্রিকভাবে নতুন গভর্নরের ১১ দফা কর্মপরিকল্পনা তিনটি মৌলিক স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে—স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন। কিন্তু নীতি ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভেতর সুদের হার সমন্বয়, খেলাপি ঋণের চাপের মধ্যে ব্যাংকিং সংস্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আস্থা পুনর্গঠন—এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময়োচিত ও তথ্যনির্ভর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে এবং স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করতে সক্ষম হয়, তবে এই কর্মপরিকল্পনা অর্থনীতিকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির পথে পরিচালিত করতে সহায়ক হতে পারে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধার একটি একদিনের প্রক্রিয়া নয়; এটি আস্থা, শৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের সমষ্টিগত ফল। প্রথম দিনেই সুস্পষ্ট নীতিগত বার্তা দিয়ে গভর্নর একটি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এখন সময়ই বলবে, ঘোষিত এই কর্মসূচি কত দ্রুত বাস্তব ফলাফল বয়ে আনতে পারে এবং বাংলাদেশ কি স্থিতিশীলতার ভিত্তির ওপর একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Our Like Page