
সেবার নামে জিম্মি দশা—সরকারি দপ্তরে ‘প্রাতিষ্ঠানিক ভিক্ষাবৃত্তি’ ও দুর্নীতির মহোৎসব
মো: আসাদুজ্জামান-(স্টাফ রিপোর্টার)
রাষ্ট্রের সেবক হওয়ার শপথ নিয়ে যারা সরকারি চেয়ারে বসেন, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের নৈতিক পতন আজ সাধারণ মানুষের জীবনকে নরকতুল্য করে তুলেছে। ১০ টাকা থেকে ১০০ টাকা—অংকের বিচারে যা-ই হোক না কেন, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা কাজ আটকে রেখে সাধারণ মানুষকে অর্থ দিতে বাধ্য করা মূলত এক ধরণের ‘ক্ষমতার দাপটে করা ভিক্ষাবৃত্তি’। এটি কেবল দুর্নীতি নয়, বরং সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকারের ওপর সরাসরি চপেটাঘাত।
শিক্ষাখাতে নৈতিকতার অবক্ষয় ও লুটপাট
স্কুল-কলেজের প্রধান বা সহ-প্রধান শিক্ষকরা হলেন সমাজ গড়ার কারিগর। কিন্তু যখন তারা দুর্নীতির নেশায় মেতে ওঠেন, তখন পুরো জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। সরকার নির্ধারিত ফি-এর তোয়াক্কা না করে ভর্তি, ফরম ফিলাপ বা প্রশংসাপত্রের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে এই ‘ফি-বাণিজ্য’ মূলত এক ধরণের জঘন্য অপরাধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত হয়, তখন সেখান থেকে আদর্শ নাগরিক আশা করা বিলাসিতা মাত্র।
ভূমি অফিসের ‘ঘুষ-রাজত্ব:
সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভোগান্তির নাম আজ ‘ভূমি অফিস’। নামজারি (মিউটেশন) থেকে শুরু করে পর্চা তোলা—প্রতিটি ধাপে টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না। পিয়ন থেকে কর্মকর্তা, এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। নিজের জমির খাজনা দিতে গিয়েও যখন মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়, তখন বুঝতে হবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কত গভীরে। ভূমি অফিসের এই ‘ঘুষ-সংস্কৃতি’ মূলত সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এক বৈধ ফাঁদ।
কৃষি অফিসে কৃষকের রক্তক্ষরণ:
দেশের অর্থনীতির প্রাণ যারা, সেই কৃষকদের সাথেও চলছে চরম প্রতারণা। কৃষি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সার, বীজ বা সরকারি প্রণোদনা বিতরণে নয়ছয় করছেন। প্রকৃত কৃষকের বদলে প্রভাবশালীদের তালিকায় নাম তোলা বা সামান্য পরামর্শের জন্য কৃষকের কাছ থেকে টাকা দাবি করা এক ধরণের ‘রক্তচোষা’ আচরণ। কৃষকের ঘাম ঝরানো টাকায় যারা পকেট ভারি করছেন, তাদের ক্ষমা করার কোনো সুযোগ নেই।
স্বাস্থ্যখাতে ‘নরহত্যা’র মহড়া:
সরকারি হাসপাতালগুলোতে অসহায় রোগীরা আসে শেষ আশ্রয় হিসেবে। সেখানে রোগীর জন্য বরাদ্দ দেওয়া সরকারি ওষুধ অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া বা রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য করা কেবল দুর্নীতি নয়, এটি সরাসরি ‘পরিকল্পিত নরহত্যা’। হাসপাতালের বেড থেকে শুরু করে ট্রলি—প্রতিটি জায়গায় সিন্ডিকেটের থাবা। সাধারণ মানুষের হক মেরে খাওয়ার এই ঘৃণ্য সংস্কৃতি সমূলে উৎপাটন করা জরুরি।
স্থানীয় সরকার ও উন্নয়নের নামে ভাওতাবাজি:
উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের একটি অংশ আজ উন্নয়ন বরাদ্দে ভাগ বসাতে ব্যস্ত। স্থানীয় রাস্তাঘাট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। পিচ ঢালাইয়ের কয়েকদিন পরেই যখন রাস্তা ছিঁড়ে যায়, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় জনগণের টাকা দিয়ে কারা পকেট ভরছে। একইসাথে বাজারে ভেজাল খাদ্য পরিবেশন করে জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে, অথচ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন।
নিরাপত্তার নামে হয়রানি:
জনগণের জানমালের রক্ষক হিসেবে পুলিশের দায়িত্ব নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখনো অনেক ক্ষেত্রে জিডি বা অভিযোগ নিতে সাধারণ মানুষকে অর্থ দিতে হয়। রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না। পুলিশের এই ‘বকশিশ সংস্কৃতি’ মূলত জিম্মি করে অর্থ আদায়ের নামান্তর।
আমাদের চূড়ান্ত দাবি ও প্রতিকার:
বিভাগীয় শাস্তি ও জেল: ঘুষ, অতিরিক্ত ফি বা সরকারি সম্পদ আত্মসাতের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কেবল ‘বদলি’ নয়, সরাসরি বরখাস্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
ডিজিটাল মনিটরিং: ভূমি অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি লেনদেন অনলাইনে নিশ্চিত করতে হবে।
গোপন নজরদারি: প্রতিটি সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ছদ্মবেশী তদারকি বাড়াতে হবে।
জনতার প্রতিরোধ: প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই ‘পেশাদার ভিক্ষাবৃত্তি’র বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে একজন সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে নির্ভয়ে কথা বলবে, হাসপাতালে তার প্রাপ্য ওষুধ পাবে, ভূমি অফিসে হয়রানি ছাড়া কাজ সারবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ন্যায্য মূল্যে শিক্ষা গ্রহণ করবে। এই জিম্মি দশা ও দুর্নীতির মহোৎসব বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
মো: আসাদুজ্জামান
সহকারী শিক্ষক
বুকাবুনিয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়,
বামনা,বরগুনা।

