
কুষ্টিয়ায় চালের দামের ওপর বাড়তি পরিবহন ভাড়ার প্রভাব।
আবদুল্লাহ আল বিন জুবায়ের
বিশেষ প্রতিনিধি : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশের অন্যতম বৃহত্তম চালের মোকাম খাজানগরে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। নতুন বোরো ধানের বাজারদর কম হলেও পরিবহন খরচ বাড়ায় চাল উৎপাদনে খরচ বাড়ছে। দূরত্ব অনুযায়ী দেড় হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি ট্রাক ভাড়া গুনতে হচ্ছে মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের। এদিকে তেলের দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে অতিরিক্ত মজুত করতে ও ফায়দা লুটতে না পারে, সেজন্য তদারকি বাড়িয়েছে খাদ্য বিভাগ। রমজানের পর থেকেই ধানের দাম কমায় চালের দামও কমেছিল খাজানগর মোকামে। দেশের বাইরে থেকে চাল আমদানি, দেশের অভ্যন্তরীণ ধান ও চালের মজুত থাকায় বাজার স্থিতিশীল রয়েছে কয়েক মাস ধরে। চলতি বোরো মৌসুমেও ভালো ফলন হয়েছে দেশে। ধান কাটা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে মোকামে চালের দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সকালে খাজানগর মোকাম ঘুরে মহাজন, ব্যবসায়ী ও মিলারদের সঙ্গে কথা বলে ধান ও চালের বাজারে প্রভাব পড়ার বিষয়টি জানা গেছে। মমিন হোসেন নামের একজন মহাজন জানান, তিনি নেত্রকোনা জেলা থেকে নতুন হীরা ধান (মোটা জাত) এক ট্রাক নিয়ে এসেছেন। নেত্রকোনা থেকে কুষ্টিয়ায় মিলগেটে ট্রাক ভাড়া পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। আগে ভাড়া ছিল ২২ থেকে ২৩ হাজারের মধ্যে।
নতুন মোটা জাতের ভেজা ধানের দাম কম হলেও পরিবহন খরচ বাড়ায় পরতা বেশি পড়ছে। এই ধানে প্রতি মণে চাল হবে ১৮ থেকে ২০ কেজি। তাতে চলের উৎপাদন খরচ পড়বে ৪৩ থেকে ৪৫ টাকা। তেলের খরচ না বাড়লে এই একই চাল ৪০ টাকা হতো। ৩ থেকে ৪ টাকা খরচ বাড়ায় ভোক্তাদেরও বেশি দামে কিনতে হবে। মোকাম ঘুরে দেখা গেছে, চালের কেনাবেচা কম। মিলারদের ঘরে পুরোনো চাল রয়েছে। ধানও আছে কোনো কোনো মিলে।
পুরোনো ধান এখন ফড়িয়া ও মহাজনদের ঘরে আছে বলে জানান মিল মালিকরা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ধানের বাজার কম। নতুন ধান মানভেদে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০ টাকায়। মিলগেটে আনায় এক হাজার ১০০ টাকার মতো খরচ পড়ছে। আর পুরোনো সরু ধান বাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২৮০ টাকা থেকে এক হাজার ৩০০ টাকায়। মাঝারি ও মোটা জাতের পুরোনো ধান এক হাজার ১০০ টাকা থেকে এক হাজার ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
দুই মাস আগের তুলনায় চালের দামও মিল গেটে এখন কম। সরু চাল মানভেদে ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। প্রতি কেজির দাম ৭০ টাকা। আর মাঝারি জাতের বিআর ২৮, কাজললতাসহ অন্যান্য জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ টাকা থেকে ৬০ টাকার মধ্যে। মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৩ থেকে ৪৪ টাকায়। আমিরুল ইসলাম নামের একজন হাসকিং মিল মালিক জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচের পাশাপাশি বেড়েছে বস্তার দাম।
নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়লে চালের বাজার বেড়ে যাবে। এ ছাড়া শোডশেডিং আছে। সব মিলিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন করে যে ধান কেনা হচ্ছে, সেই চাল বাজারে যাওয়ার আগে দাম বাড়তে পারে।
মিয়া ভাই অটো রাইস মিলের মালিক ও চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন, ‘কুষ্টিয়া থেকে আগে চালবোঝায় ট্রাক ঢাকাসহ চট্টগ্রামের বাজারে যেতে যে খরচ হতো, তা বেড়েছে। এক ট্রাক চাল ঢাকায় পাঠাতে ৭০ থেকে ৭৫ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে খরচ বেড়েছে এক হাজার ৪০০ টাকার মতো। এখন যে মহাজনরা চাল কিনছেন, তাদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এ বাড়তি অর্থ চালের দামে যোগ হচ্ছে।
হাজি লিয়াহক হোসেন নামের একজন মিলার বলেন, জ্বালানি, বিদ্যুৎ আর শ্রমিকদের বেতন বাড়ায় নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন ধান কেনা পুরোদমে শুরু হলে মোকামে দাম বাড়তে পারে। দুই থেকে তিন মাস পর প্রভাব বেশি পড়তে পারে। কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম থেকে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় দিনে দেড় থেকে দুইশ ট্রাক চাল যায়। পাশাপাশি দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চল থেকে ট্রাকবোঝাই করে ধান আসে।

