
জাতীয় ঋণ ও ইতিহাসের দায়: বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান
-প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, ভাইস-চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া ও রাজনীতি বিশ্লেষক।
গত ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে মহান জাতীয় সংসদের ভিআইপি গ্যালারিতে (গ্যালারি ২) উপস্থিত থেকে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এমপি’র ২০ মিনিটের এক ঐতিহাসিক বক্তব্য খুব কাছ থেকে দেখার ও শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই সময় সংসদ কক্ষে যে পিনপতন নীরবতা এবং পরবর্তীতে টেবিল চাপড়ানির মাধ্যমে মাননীয় সংসদ সদস্যদের উচ্ছ্বসিত ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দেখেছি, তা কেবল সংসদীয় রাজনীতির কোনো সাধারণ দৃশ্য ছিল না। এটি ছিল মূলত রাষ্ট্রের ভেতর সুপ্ত থাকা এক গভীর ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদ এবং অ্যাকাডেমিক গবেষক হিসেবে এই বক্তব্যটি আমাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তির তত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক ঋণ পরিশোধের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি নিয়ে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এমপি সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেনঃ
“বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান কোনো সাধারণ ভাতার হিসাব নয়, এটি জাতির ঋণের স্বীকৃতি। কোনো কারণেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার সঙ্গে অন্য কারও ভাতার তুলনা হতে পারে না।”
তার এই বক্তব্য শুধু একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত মতামত নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কোটি মানুষের অনুভূতির সুনির্দিষ্ট ও তাত্ত্বিক প্রতিফলন।
মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান: তাত্ত্বিক ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণঃ
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যেকোনো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও নৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে তার ঐতিহাসিক ভিত্তিমূলের ওপর। ১৯৭১ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা কোনো সাধারণ রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী (Beneficiary) হিসেবে যুদ্ধ করেননি। তাঁরা জীবন বাজি রেখেছিলেন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীন পতাকার জন্য।
অর্থনীতির সরল সমীকরণ দিয়ে এই আত্মত্যাগকে পরিমাপ করা অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক। মুক্তিযোদ্ধাদের যে ‘সম্মানী ভাতা’ দেওয়া হয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় তা কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net) বা অনুদান নয়; Post-war বা যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক দর্শনে এটি হলো ‘Recognition of National Debt’ বা জাতীয় ঋণের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র বিনির্মাণের পেছনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যে অমোঘ অবদান, তার ঋণ রাষ্ট্র কখনোই পুরোপুরি শোধ করতে পারে না। ভাতা মূলত সেই ঐতিহাসিক কৃতজ্ঞতার একটি প্রতীকী ও রাষ্ট্রীয় প্রকাশ মাত্র।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ: তুলনামূলক অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণঃ
অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এমপি অত্যন্ত সময়োপযোগীভাবে সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করেই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সত্য উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন—জুলাই বিপ্লবী আর বীর মুক্তিযোদ্ধা কখনো এক হতে পারে না।
একাডেমীক পরিভাষায়, এই দুটি ঘটনার ঐতিহাসিক, কাঠামোগত এবং দার্শনিক ধরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন:
জুলাই গণঅভ্যুত্থান:
এটি ছিল একটি প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ফ্যাসিবাদের অবসান, নাগরিক অধিকারের পুনর্বিন্যাস এবং সম্পূর্ণ নতুন এক ‘রাষ্ট্রীয় চুক্তি’ (New Social Contract) বিনির্মাণের লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব, রক্তক্ষয়ী ও গৌরবোজ্জ্বল গণঅভ্যুত্থান। যা মূলত একটি রাষ্ট্রের শাসনকাঠামোর আমূল সংস্কার এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার এক যুগান্তকারী মহাজাগরণ।
মহান মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১):
এটি ছিল মূলত পাকিস্তানি নব্য-ঔপনিবেশিক (Neo-colonial) শোষণ ও আধা-ঔপনিবেশিক শাসন এবং চরম বৈষম্যের হাত থেকে জাতিকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ও নতুন মানচিত্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সশস্ত্র যুদ্ধ। যেখানে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ৩০ লক্ষ মানুষকে জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছিল।
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের জন্য ২০ হাজার টাকা মাসিক ভাতার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং তা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের অংশ। কিন্তু এই ভাতার অঙ্ককে বা বিষয়টিকে মুক্তিযুদ্ধের সম্মানী ভাতার সাথে সমান্তরাল লাইনে দাঁড় করিয়ে তুলনা করা তাত্ত্বিকভাবে মারাত্মক ভুল। একজন মুক্তিযোদ্ধা ১ টাকা হলেও বেশি পাওয়ার অধিকার রাখেন, কারণ তাঁর অবদানের ওপর ভিত্তি করেই আজকের এই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি এবং এর সমস্ত প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।
জাতীয় দায়বদ্ধতা এবং দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে মর্যাদাঃ
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে যাঁদের ত্যাগ রয়েছে, তাঁদের সম্মান করা কোনো নির্দিষ্ট দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা হতে পারে না—এটি একটি চিরন্তন জাতীয় দায়িত্ব। মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দল বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন। স্বাভাবিকভাবেই, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ, জাতীয় বীরদের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা এবং তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের ওপর একটি ঐতিহাসিক ও নৈতিক দায় বর্তায়। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এমপি’র উত্থাপিত এই যৌক্তিক ও আবেগঘন দাবি যে বৃথা যাবে না, তা সংসদের ভেতরে সদস্যদের দলমত নির্বিশেষে সমর্থন দেখেই দৃঢ়ভাবে অনুমেয়।
সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম একটি সত্য হলো, যে জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সম্মান করতে জানে না, সে জাতি বিশ্বদরবারে কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ, আর বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ মানুষ বীর মুক্তিযোদ্ধারা। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একজন বাংলাদেশি উপাচার্য হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদার প্রশ্নে কোনো প্রকার আপস বা অন্য কোনো বিষয়ের সাথে এর তুলনামূলক সমীকরণ খোঁজা রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াত্বের শামিল।
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এই দাবিকে কেবল একটি অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব হিসেবে না দেখে, একে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও বাংলাদেশের অস্তিত্ব অক্ষুণ্ন রাখার একটি জাতীয় স্মারক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান সরকারের কাছে বিনীত আহ্বান, এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের প্রস্তাবটি আমলে নিয়ে আসন্ন বাজেটে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার গৌরবময় স্বাতন্ত্র্য ও শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করা হোক।
লেখকঃ -প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, ভাইস-চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

