
অবসরে থেকেও লাইব্রেরি দিয়ে এলাকায় জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছেন চুয়াডাঙ্গার অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক নুরুল ইসলাম।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি ঃ
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর পৌরসভার ৩নং বোর্ডের থানা পাড়ার রাজনগর গ্রাম। গ্রামটি পৌর শহরে অবস্থিত হলেও এখানকার মানুষের জীবনমানের তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি বললেই চলে। পৌর শহর থেকে এ গ্রামের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। যে গ্রামে দুই হাজার থেকে তিন হাজার মানুষের বসবাস। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন সাবেক স্কুল শিক্ষক নুরু স্যার । তিনি উপজেলা ব্যাপী ও শিক্ষার্থীদের নিকট ব্যাপক ভাবে নুরু স্যার হিসাবে পরিচিত হলেও তার পুরো নাম নুরুল ইসলাম। তিনি অবসরপ্রাপ্ত একজন স্কুল শিক্ষক। জীবননগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দৌলৎগঞ্জ সরকারী মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা জীবনে অবসর নিয়েছেন।
দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে অনেক ছাত্রছাত্রীর মাঝে তিনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। ২০০৭ সালে অবসর নেয়ার পর ২০০৯ সালে নিজ বাড়ীতে একক প্রচেষ্টায় গড়ে তোলেন একটি লাইব্রেরী। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে এটি একটি জরাজীর্ণ পরত্যিাক্ত আধাপাকা ঘর। কিন্তু এই ঘরের মধ্যেই তিনি গড়ে তুলেছেন একটি পাঠাগার। তার পাঠাগারে বর্তমানে দুই সহ¯্রাধিকের মত বই রয়েছে। আর্থিক অনটনের কারনে ঘরের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং এ বই নিয়ে তিনি সন্তষ্ট নন। তার প্রবল ইচ্ছা পাঠাগারটির উন্নত পরিবেশ ও বইয়ে বইয়ে ভরে উঠুক। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তার সে ইচ্ছা পূরণ হচ্ছে না বলে জানান।
প্রতি মাসে অবসর ভাতা পেলেই কিছু বই কিনে বাড়ী ফিরেন তিনি। এমনও দিন গেছে বাজারের ব্যাগ নিয়ে গেছেন বাজার করতে কিন্তু বাজার করা হয়নি। কারন এসময় তার বই পছন্দ হওয়ায় বই কিনে বাড়ি ফিরেছেন খালি বাজারের ব্যাগ হতে। তার লাইব্রেরীতে ধর্মীয়ও ইতিহাস-ঐতিহ্য সংক্রান্ত বইয়ের সংখ্যা বেশী। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু-কিশোর ও নারী শি¶া বিষয়ক বই তার লাইব্রেরীতে দেখা যায়। এছাড়া রয়েছে রান্না বিষয়ক বই এবং রুপ চর্চার বই ও রয়েছে তার পাঠাগারে।
তিনি জানান, তার দৃষ্টিতে লাইব্রেরীর বইগুলো তার সন্তানের মত। অন্যান্য লাইব্রেরীর চেয়ে তার লাইব্রেরীটি ব্যতিক্রমধর্মী। তার পাঠাগারে সকাল-বিকাল শিশু থেকে বৃদ্ধরা বই পড়তে আসে। এখানে বসার জন্য নেই কোন চেয়ার-টেবিল। অনেক পাঠক তাদের পছন্দ মত তার লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে যান এবং পড়া শেষে আবার বইটি পাঠাগারে ফেরত দিয়ে যান। বিনিময়ে কারো নিকট থেকে কোন টাকা পয়সা কিংবা কোন উপঢৌকন নেয়া হয় না। তবে কেউ ইচ্ছা করলে খুশি হয়ে দু’একটি বই কিনে দিতে পারেন। লাইব্রেরীটিতে বর্তমানে শিশু থেকে বয়স্ক সব শ্রেণীর বই পাওয়া যায়। নুরু স্যার ভাল কোন বইয়ের সন্ধান পেলে তা কিনতে অস্থির হয়ে পড়েন। তিনি ধার দেনা করে হলেও সেই বই কিনতে মরিয়া হয়ে পড়েন।
পাঠাগারের নিয়মিত কয়েকজন পাঠক অভিন্ন ভাষায় বলেন, আমরা নুরু স্যারের ছাত্র আমরা। আমাদের এলাকায় জ্ঞান অšে^ষনের জন্য কোন পাঠাগার নেই। তবে স্যারের একক প্রচেষ্টায় তার নিজ বাড়ীতে লাইব্রেরী গড়ে ওঠায় এলাকার ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি বই পড়ুয়া নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরেরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আমরা তার পাঠাগারে নিয়মিত পাঠক।
অনেক সময় বই নিয়ে যাই এবং পড়া শেষে তা ফেরত দিই। তিনি বিনিময়ে কোন টাকা পয়সা কারো নিকট থেকে নেন না। স্যারকে কেউ যদি সহযোগীতা করতেন তাহলে তিনি আরো বই কিনে পাঠকদের জন্য সুযোগ করে দিতে পারতেন। স্যার আর্থিক ভাবে একজন অভাবগ্রস্থ মানুষ। তার সাধ থাকলেও পাঠাগারটি বইয়ে বইয়ে ভরে তোলার মত তার কোন সাধ্য নেই। তবে স্যারের অনেক ছাত্রছাত্রী দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তারা ইচ্ছা করলেই স্যারের শেষ জীবনের ইচ্ছাটুকু পুরণ করতে সহযোগীতার হাত বাড়াতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস।
নুরুল ইসলাম নুরু স্যার বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকে আমার বই পড়ার ওপর প্রবল ঝোঁক ছিল। সে সময় আমি অর্থাভাবে বই কিনে পড়তে পারিনি। চাকুরি জীবনেও সুযোগ পাইনি।
সে সময় থেকে আমার শখ ছিল কখন যদি সুযোগ হয় ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও একটি লাইব্রেরী গড়ে তুলব। চাকুরি থেকে অবসর নেয়ার পর পরই বই সংগ্রহ শুরু করি এবং বর্তমানে নিজ বাড়ীতে ছোট পরিসরে একটি পাঠাগার তৈরী করেছি। তবে এখনও ইচ্ছানুযায়ী বই সংগ্রহ করতে পারিনি। প্রতি মাসে যে অবসর ভাতা পাই তা দিয়ে কিছু কিছু বই কিনে পাঠাগারটি সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন,আমার অনেক ছাত্রছাত্রী বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে বড় বড় কর্মকর্তা হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। আমার বিশ্বাস তাদের কাছে পাঠাগারের ব্যাপারে সহযোগীতা চাইলে তারা না করবে না। কিন্তু আমি তো লজ্জায় তাদের সাথে বলতে পারি না।
আমি চাই এলাকার বিত্তবানদের পাশাপাশি আমার হাতে গড়া ছাত্রছাত্রীরা এগিয়ে আসুক। বর্তমানে পাঠাগারটি নিয়েই আমার যত স্বপ্ন- সাধনা। আমার মৃত্যুর পরও আমি পাঠাগার ও পাঠকের মাঝে বেঁচে থাকতে চাই।

