
নুসরাত হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, ১০ জন খালাস
মো: আল-মাহফুজ শাওন
ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ১৬ আসামির মধ্যে দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়কে কেন্দ্র করে নুসরাতের পরিবারের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচন্দিয়া এলাকায় নুসরাতদের বাড়িতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রায় প্রসঙ্গে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে তিনি এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি। নিম্ন আদালতে তারা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। তবে তিন ছেলেকে নিয়ে এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পুলিশ তাদের সার্বিক নিরাপত্তা দিচ্ছে। সরকারের কাছে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
যেভাবে হত্যার ঘটনা
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন নুসরাতের মা শিরীন আখতার। ওই মামলার পর পুলিশ অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করে।
এরপর তার অনুসারীরা তাকে কারাগার থেকে বের করে আনার জন্য নানা তৎপরতা শুরু করে। ৩ এপ্রিল কারাগারে সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে দেখা করে তার সহযোগীরা। পরদিন ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে নুসরাতকে কৌশলে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে আগুন দিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়।
অগ্নিদগ্ধ ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তৎকালীন বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।
মামলা ও দ্রুত বিচার
নুসরাতের মৃত্যুর পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২৮ মে ১৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। পরে ২০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
মামলায় ৮৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ হয় মাত্র ৬১ কার্যদিবসে। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর দিন ধার্য করেন।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল
বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে আইন অনুযায়ী তা অনুমোদনের জন্য মামলার সব নথি উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হিসেবে মামলার নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। একই সঙ্গে আসামিরাও জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।
পরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট মামলায় রায় ঘোষণা করেন। এতে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের যাবজ্জীবন এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
নুসরাত হত্যা মামলা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তার ওপর চালানো নির্মম হামলার পর দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সোচ্চার হয়েছিলেন। হাইকোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধাপ সম্পন্ন হলো।

