
” শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রহিমাহুল্লাহ”
মোঃ রেজাউল করিম
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় শাহাদাত বার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি-
১৯৪০ সালের পবিত্র রমজান মাসের ৭ তারিখে স্নিগ্ধ প্রভাতে, পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী গ্রামে জন্ম নেন বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন, এ যুগের মুজাদ্দিদ, মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহিমাহুল্লাহ)। তাঁর জন্ম যেন ছিল এক আলোর আগমন, যা পরবর্তী দশকগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছিল দেশমাতৃকার সীমানা পেরিয়ে বিশ্বময়। পিতা মাওলানা ইউসুফ সাঈদী ছিলেন এক স্বনামধন্য ইসলামী পণ্ডিত, আর মা গুলনাহার বেগম ছিলেন এক স্নেহশীল, ধর্মপ্রাণ গৃহিণী যাঁর দোয়া ও লালনেই গড়ে ওঠেন এই মহান দাঈ।
*শিক্ষা ও জ্ঞানসাধনা:-
শৈশবে পিতার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় তিনি শিক্ষা জীবন শুরু করেন। পরে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসায় কিছুদিন অধ্যয়নের পর ১৯৬২ সালে ঐতিহ্যবাহী ছারছিনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল সম্পন্ন করেন। শুধু দ্বীনি শিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং কামিল পাশের পর তিনি পাঁচ দীর্ঘ বছর ব্যাপী বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম, বিজ্ঞান,রাজনীতি, অর্থনীতি,পররাষ্ট্রনীতি, মনোবিজ্ঞান ও অন্যান্য তত্ত্বের গভীর অধ্যয়নে নিমগ্ন থাকেন যেন নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন সর্বাঙ্গীণ দাঈ হিসেবে।
*দাওয়াতি জীবন:
১৯৬৭ সাল থেকে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন ‘দায়িইলাল্লাহ’হিসেবে। তাঁর কণ্ঠের তাফসিরে কুরআনের আয়াতগুলো যেন হৃদয়ের দরজায় এসে কড়া নাড়ত, তাঁর যুক্তি ও বয়ানে মানুষ খুঁজে পেত জীবনের দিশা। অর্ধশতাধিক দেশের মাটিতে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন ইসলামের পবিত্র দাওয়াত। পবিত্র কাবা শরীফের সম্মানিত ইমামের উপস্থিতিতে দু’বার প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখার গৌরবও তাঁর প্রাপ্য।
*রাজনৈতিক ভূমিকা:
১৯৭৩ সালে সাধারণ সমর্থক হিসেবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে শীর্ষ নেতৃত্বের আসনে পৌঁছান। ১৯৮৯ সালে মজলিসে শুরার সদস্য এবং পরবর্তীতে দলের নায়েবে আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সততা,সাহস ও প্রজ্ঞার সাথে।
*বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃতি:
১৯৭৬ সাল থেকে সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে প্রায় প্রতিবছরই তিনি রাজকীয় অতিথি হিসেবে হজ্জব্রত পালন করেন। ১৯৮২ সালে ইরানের আমন্ত্রণে বিপ্লব বার্ষিকী উদযাপনে যোগ দেন,১৯৯১ সালে সৌদি বাদশাহর আহ্বানে কুয়েত-ইরাক যুদ্ধ মীমাংসা বৈঠকে অংশ নেন। ১৯৯৩ সালে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সামনে আমেরিকান মুসলিম ডে প্যারেডে তাঁকে দেওয়া হয় “গ্র্যান্ড মার্শাল” সম্মাননা। দুবাই সরকারের আমন্ত্রণে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের সামনে তাঁর তাফসির মাহফিল ছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। তাঁর হাত ধরে ছয় শতাধিক অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছেন, যা তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনগুলোর একটি।
*কারাবরণ ও শাহাদাত:
১৯৭৫ সালে (মুজিবের শাসনামলে) প্রথমবার তিনি কারাবরণ করেন। দ্বিতীয়বার ২০১০ সালের ২৮ জুন গ্রেফতার হন তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা মামলায়। আমৃত্যু কারাবাসে রেখে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করা হয় জনগণের ভালোবাসা থেকে। তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে কয়েক শত মানুষ শাহাদাত বরণ করেন। অবশেষে ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট, জালিম শাসকের কারাগারে মেডিকেল কিলিং-এর মাধ্যমে তিনি শহীদি মৃত্যু লাভ করেন। ১৩ বছরের কারাবাস,অগণিত নির্যাতন সহ্য করেও তিনি ঈমানের ময়দানে অবিচল ছিলেন।
আজ তাঁর দ্বিতীয় শাহাদাত বার্ষিকীতে কোটি কোটি হৃদয় তাঁকে স্মরণ করছে অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধায়। আমরা দোয়া করি আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন, আর তাঁর রেখে যাওয়া দাওয়াতি ও ত্যাগের আলোকরেখা আমাদের আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাক অনন্তকাল।
লেখক ও কবি:-
আল আমিন হিজাযী,
সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক,
নোঙর সাংস্কৃতিক সংসদ ময়মনসিংহ।
সোহাগি সাহিত্য পরিষদ-ময়মনসিংহ বিভাগ।
সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক।

