
আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর বাস্তবতার দ্বন্দ্বে কুষ্টিয়ার ইট ভাটা শিল্প
আবদুল্লাহ আল বিন জুবায়ের, কুষ্টিয়া।
কুষ্টিয়া জেলার ইটভাটাগুলো চলছে ধিকিধাকি করে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় স্বাভাবিক কার্যক্রম, কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি ভাটা মালিক দিন কাটাচ্ছেন চরম আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সখ্যতা গড়ে ওঠা এই শিল্পটি পুরোপুরি নির্ভরশীল
আবহাওয়ার ওপর। আকাশে সূর্যের দেখা না মিললেই শুরু হয় নানা দুশ্চিন্তা—বৃষ্টি নাকি ঝড়, কখন কোন বিপদ নেমে আসে, সেই আশঙ্কা নিয়েই প্রতি দিন ভাটা চালাতে হয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে প্রশাসনিক নানা জটিলতা। একদিকে কয়লা, খড়ি বা যাই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হোক না কেন—সরকারের একটি নির্ধারিত সেক্টর ভ্যাট আদায়ে মরিয়া। অপরদিকে আরেকটি সরকারি সংস্থা, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছে—এই ভাবে ভাটা চলতে পারে না। মাঝেমধ্যেই জেলার বিভিন্ন উপজেলার ইট ভাটায় অভিযান চালিয়ে ভাটা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে এবং সকল কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে।
তবুও থেমে নেই এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। কুষ্টিয়া জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক ভাটা মালিকের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে একই ধরনের বাস্তব চিত্র ও অভিযোগ।
ভাটা মালিকরা প্রতিবেদককে জানান, “আমরা যদি ভাটা বন্ধ করে দিই, তাহলে সরকারি-বেসরকারি বহু উন্নয়নমূলক কাজ একেবারে থমকে যাবে। আমরা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথেই সরাসরি যুক্ত। শুধু ইট সরবরাহই নয়, এলাকার মসজিদ, মন্দির, মাদ্রাসা, এতিম খানা সহ নানা সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে আমরা সহযোগিতা করে থাকি। পাশাপাশি এলাকার গরিব ও অসহায় মানুষদের বিয়ে, সুন্নতে খতনা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও আমরা পাশে থাকি।”
তথ্যসূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া জেলায় বর্তমানে মোট ২১৬টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৪২টি হাওয়া ভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৩টি ভাটার। চলতি বছরে হাইকোর্টে রিট করেছেন ২২ জন ভাটা মালিক।
ভাটা মালিকদের দাবি, কুষ্টিয়া জেলা থেকেই প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা ভ্যাট সরকারকে প্রদান করা হয়, যার সঙ্গে যুক্ত থাকে আয়করসহ অন্যান্য রাজস্ব। অর্থাৎ এই শিল্প সরকারকেও একটি বড় অঙ্কের রাজস্ব যোগান দিয়ে আসছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান। কুষ্টিয়া জেলায় প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক সরাসরি ইটভাটা শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাদের পরিবার-পরিজনসহ লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ভাটা বন্ধ হয়ে গেলে এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের ভবিষ্যৎ কী হবে সেই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই।
ভাটা মালিকরা বলেন, “আমরা মালিকরা হয়তো অন্য কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য করে টিকে থাকতে পারব, কিন্তু দিনমজুর শ্রমিকরা যাবে কোথায়? তাদের সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের ভরণপোষণ—সবকিছুই অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।”
তাদের আরও অভিযোগ, যদি সরকার নীতিগত কারণে ভাটা বন্ধ করতেই চায়, তাহলে তা ভাটা চালু হওয়ার আগেই জরুরি নোটিশ দিয়ে জানানো উচিত। নির্ধারিত নীতিমালা ও বাস্তব সম্মত পরিকল্পনা ছাড়া হঠাৎ করে ভাটা বন্ধ করে দেওয়া হলে এর দায়ভার শুধু মালিক নয়, পুরো সমাজকেই বহন করতে হবে।
পরিবেশ রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সচেতন মহলের মতে, ইটভাটা শিল্পের ক্ষেত্রে দরকার সমন্বিত নীতি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ধাপে ধাপে রূপান্তর। একদিকে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে রক্ষা পাবে হাজারো শ্রমিকের জীবিকা ও দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।
কুষ্টিয়ার ইটভাটা শিল্প আজ তাই এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন ভাটা মালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সবাই।

