
গণভোটে ‘হ্যাঁ’: রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক অনিবার্য মুহূর্ত
মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে। এদিন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি গণভোট—যার ফল কেবল একটি প্রশ্নের উত্তর দেবে না, বরং নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ দর্শন, গণতন্ত্রের পথচলা এবং নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহির কাঠামো। এ প্রেক্ষাপটে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে যুক্তিনির্ভর প্রচারণা শুধু রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি জাতীয় কর্তব্য।
গণভোট মূলত সরাসরি গণতন্ত্রের একটি শক্তিশালী উপকরণ। এখানে জনগণ মধ্যস্থতাকারী কোনো প্রতিনিধি ছাড়াই নিজস্ব মতামত প্রকাশের সুযোগ পায়। ফলে এই সিদ্ধান্তের ভারও পড়ে সরাসরি জনগণের কাঁধে। তাই প্রশ্ন ওঠে—এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ কেন জরুরি? এবং যদি ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হয়, তাহলে আগামী বাংলাদেশ কোন পথে যেতে পারে?
‘হ্যাঁ’ মানে সংস্কারের পথে সম্মতি
এই গণভোটের মূল প্রস্তাব—রাষ্ট্র পরিচালনার বিদ্যমান কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচন নিয়ে অনাস্থা, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন এবং নাগরিক আস্থার সংকট স্পষ্ট। এসব সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি; বরং দীর্ঘ সময়ের অবহেলা ও একমুখী শাসনব্যবস্থার ফল।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে হলো—এই বাস্তবতাকে স্বীকার করা এবং শান্তিপূর্ণ, সাংবিধানিক পথে পরিবর্তনের জন্য সম্মতি দেওয়া। ‘হ্যাঁ’ ভোট কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি অন্ধ সমর্থন নয়; বরং এটি একটি নীতিগত অবস্থান—যেখানে জনগণ বলে, রাষ্ট্রের কাঠামো আরও জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হওয়া দরকার।
গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ
বাংলাদেশে গত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। ভোটার উপস্থিতি, প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ এবং ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা—সবকিছু মিলিয়ে একটি আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই গণভোট সেই আস্থা পুনর্গঠনের একটি সুযোগ।
‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে—তারা চায় এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে নির্বাচন মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রকৃত প্রতিযোগিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। গণভোটে উচ্চ অংশগ্রহণ ও ‘হ্যাঁ’-এর বিজয় ভবিষ্যতের সব নির্বাচনের জন্য একটি নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে।
অর্থনীতি ও বিনিয়োগ আস্থার প্রশ্ন
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। বর্তমানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ মন্দা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং কর্মসংস্থান সংকটের মুখোমুখি। এসব সমস্যার পেছনে কেবল বৈশ্বিক পরিস্থিতি নয়, অভ্যন্তরীণ শাসনসংক্রান্ত অনিশ্চয়তাও বড় ভূমিকা রাখছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে—দেশ সংস্কারের পথে এগোচ্ছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের মতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
যদি ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হয়: অনিশ্চয়তার ছায়া
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পরাজিত হলে সেটিকে কেবল একটি রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর অর্থ দাঁড়াবে—রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জাতি দ্বিধাবিভক্ত, অথবা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক। এর ফলে বিদ্যমান সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—নাগরিক হতাশা ও রাজনৈতিক উদাসীনতা আরও গভীর হওয়া। মানুষ যদি মনে করে, তাদের মতামতের মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব নয়, তাহলে তারা ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ইতিহাস বলে, এই শূন্যতা কখনোই ইতিবাচক শক্তিতে পূরণ হয় না।
রাষ্ট্র বনাম ক্ষমতা: সিদ্ধান্তের মুহূর্ত
এই গণভোট মূলত একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে জাতিকে—রাষ্ট্র কি জনগণের, নাকি ক্ষমতা কিছু গোষ্ঠীর? ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে রাষ্ট্রকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং একটি দরজা—যেখান দিয়ে সংস্কার, সংলাপ ও সমঝোতার পথে এগোনো সম্ভব।
১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট কোনো সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। এটি একটি জাতীয় আত্মজিজ্ঞাসার দিন। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা জরুরি, কারণ এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ার প্রশ্ন।
এই গণভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করাই হবে নাগরিক প্রজ্ঞার পরিচয়। ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—এই সন্ধিক্ষণে আমরা পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম, নাকি স্থবিরতাকেই মেনে নিয়েছিলাম।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
Email : msislam.sumon@gmail.com

