
“ব্যাংক রেজল্যুশন বিল ২০২৬: আস্থা পুনর্গঠনের সন্ধিক্ষণে আর্থিক খাত”
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্যাংকিং খাত যখন খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ এবং তারল্য সংকটে জর্জরিত, ঠিক তখনই ‘ব্যাংক রেজল্যুশন বিল ২০২৬’ নিয়ে আলোচনা কেবল প্রাসঙ্গিক নয় বরং অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিলটি এমন এক সময়ে উপস্থাপিত হলো যখন আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি এক জটিল সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। মুদ্রাস্ফীতির লাগামহীন ঘোড়া আর জিডিপি প্রবৃদ্ধির মন্থর গতির মাঝে ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করা জাতীয় নিরাপত্তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। বছরের পর বছর ধরে চলা অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় বড় হওয়া ব্যাংকগুলো যখন খাদের কিনারে, তখন এই নতুন আইনটি একটি জীবনদায়ী ঔষধ নাকি কেবলই একটি ব্যবচ্ছেদকারী ছুরি, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা যখন পদ্ধতিগত ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন কেবল মূলধন জোগান দিয়ে বা বিশেষ ছাড়ে সমাধান আসে না। বরং সেখানে প্রয়োজন হয় এমন এক আইনি কাঠামোর, যা কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হলে সাধারণ আমানতকারীকে সুরক্ষা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পুনর্গঠন বা বিলোপ করতে পারে।
২০২৪ ও ২০২৫ সালের অর্থনৈতিক সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের হার মোট বিতরণের প্রায় ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা প্রকৃত অর্থে এর দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক রেজল্যুশন বিল ২০২৬ যে প্রস্তাবনাগুলো সামনে এনেছে, তার মূল সুর হলো ‘বেইল-ইন’ এবং ‘বেইল-আউট’ প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা। অতীতে আমরা দেখেছি, কোনো ব্যাংক সংকটে পড়লে সরকার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেইল-আউট বা উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়েছে। এটি এক ধরনের নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে, কারণ ব্যাংকের মালিকরা জানেন যে লোকসান হলে রাষ্ট্র দায় নেবে। কিন্তু প্রস্তাবিত বিলে দায়বদ্ধতার একটি বড় অংশ ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের ওপর বর্তানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এই বিলে আমানত বীমা বা ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স স্কিমের সীমা বৃদ্ধির কথা থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের চাপা উদ্বেগ কাজ করছে। কারণ দীর্ঘদিনের অর্জিত সঞ্চয় যখন একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে। আর আস্থাহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা কোনো দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে পারে না।
গাণিতিক মডেলে যদি আমরা বিষয়টি দেখি, তবে দেখা যায় যে ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা এবং আর্থিক গভীরতা সরাসরি বিনিয়োগের গুণক প্রভাবের সাথে সম্পর্কিত। যদি ব্যাংক রেজল্যুশন বিলের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা বা যথাযথভাবে বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তবে স্বল্পমেয়াদে বাজারে তারল্যের কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি ঋণের ব্যয় কমিয়ে আনবে এবং দক্ষ ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে সাহায্য করবে। ২০২৬ সালের এই বিলটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা যেভাবে সম্প্রসারিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, তা দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো। একদিকে যেমন এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে, অন্যদিকে এর প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে এটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রকট, সেখানে কেবল আইন প্রণয়ন করলেই সমাধান আসে না, বরং আইনের প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা ও সততা এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর ইউরোপ ও আমেরিকায় রেজল্যুশন মেকানিজম নিয়ে ব্যাপক কাজ হয়েছে। সেখানে ‘লিভিং উইল’ বা ব্যাংক সংকটে পড়লে কীভাবে তার সমাধান হবে সেই পরিকল্পনা আগেই তৈরি রাখতে হয়। আমাদের দেশেও এই সংস্কৃতির প্রবর্তন হওয়া জরুরি। ব্যাংক রেজল্যুশন বিল ২০২৬-এ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার যে ধারাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদক্ষেপ। তবে মনে রাখা দরকার, ব্যাংকিং খাতের এই ক্ষত একদিনে তৈরি হয়নি। মুদ্রাস্ফীতি যখন ৯ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে, তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং ব্যাংকে জমানো টাকার প্রকৃত মূল্য হ্রাস পায়। এই কঠিন সময়ে যদি ব্যাংকগুলো তাদের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তা সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। তাই বিলটির উদ্দেশ্য হতে হবে এমনভাবে ব্যাংকগুলোর ব্যবচ্ছেদ করা যাতে সাধারণ মানুষের নূন্যতম আমানত কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
এই বিলের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ব্যাংক একীভূতকরণ বা মার্জার প্রক্রিয়া। গত দুই বছরে আমরা দেখেছি কীভাবে বেশ কিছু দুর্বল ব্যাংক শক্তিশালী ব্যাংকের সাথে একীভূত হওয়ার চেষ্টা করেছে, যদিও তার ফলাফল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অর্থনীতির ভাষায়, দুটি দুর্বল ব্যাংক মিলে কখনোই একটি সবল ব্যাংক তৈরি করতে পারে না; বরং এটি সামগ্রিক ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ব্যাংক রেজল্যুশন বিল ২০২৬-এ যদি এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। এর পরিবর্তে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে তাদের ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করার সুযোগ দেওয়া এবং ব্যর্থ হলে কেবল তখনই কঠোর রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় যাওয়া যৌক্তিক হবে। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে নেওয়া উপাত্ত অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, যার প্রধান কারণ ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতা। এই বিল যদি সঠিক সংকেত দিতে পারে, তবে বিনিয়োগকারীরা আবার আস্থা ফিরে পাবে এবং পুঁজি বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
একজন গবেষক হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এই বিলটি বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হবে প্রভাবশালী ঋণখেলাপি এবং ব্যাংকের অসাধু পরিচালকদের শক্তিশালী বলয়। বছরের পর বছর ধরে যারা ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বিলটিতে ব্যাংকের সম্পদ রিকভারি বা উদ্ধারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের যে কথা বলা হয়েছে, তা যদি দ্রুত কার্যকর না হয়, তবে এটি কেবল কাগজে-কলমে একটি নথিতে পরিণত হবে। আমাদের মনে রাখা উচিত, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা কেবল মেগা প্রজেক্টের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি টিকে থাকে সাধারণ মানুষের আস্থার ওপর। যখন একজন কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তার কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকে জমা রাখেন, তখন তিনি রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই নিশ্চয়তা চান যে তার টাকা নিরাপদ। ব্যাংক রেজল্যুশন বিল ২০২৬ যদি সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা আর্থিক খাতের জন্য এক বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ব্যাংক রেজল্যুশন বিল ২০২৬ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হলেও এর সফলতার চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে এর নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর। ব্যাংকগুলোকে স্রেফ একটি সংখ্যা হিসেবে না দেখে সেগুলোকে অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালনকারী ধমনী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যদি এই ধমনীতে ব্লকেজ তৈরি হয়, তবে পুরো শরীর যেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ে, অর্থনীতির অবস্থাও ঠিক তেমনটাই হবে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে, ব্যাংক মেরামত করার অর্থ কেবল কিছু নিয়ম পরিবর্তন করা নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গীকার। আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো হবে এবং এই বিলে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোই ঠিক করে দেবে আমরা কি স্থিতিশীলতার দিকে যাব নাকি দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কবলে পড়ব। ব্যাংক রেজল্যুশন বিল যেন কেবল শক্তিশালীকে আরও শক্তিশালী করার হাতিয়ার না হয়, বরং এটি যেন হয় একটি ন্যায়সঙ্গত এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থা গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর। আমানতকারীর স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে যদি এই বিলের সংশোধন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, তবেই কেবল ২০২৬ পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি টেকসই ও মজবুত ভিতের ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com

