
নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রধান শিক্ষকের গাছ সাবাড়: শাল্লায় তোলপাড়, নেপথ্যে কার খুঁটির জোর?
শংকর ঋষি সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
সরকারি বিধিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিদ্যালয়ের লক্ষাধিক টাকা মূল্যের সরকারি সম্পদ লুটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শাহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরিফ মোহাম্মদ দুলালের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার টেন্ডার বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ১৩টি মূল্যবান গাছ কেটে সাবার করার এই ঘটনাটি ঘটেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো অদৃশ্য শক্তির ইন্ধনে বা কার খুঁটির জোরে তিনি বারবার এমন দুঃসাহস দেখাচ্ছেন, তা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১০ জুলাই শুক্রবার সন্ধ্যায় শাহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, কাটা গাছগুলো তড়িঘড়ি করে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা হচ্ছে। ঘুঙ্গিয়ারগাঁও মুসলিম পাড়ার নুরু মিয়ার ছেলে মফিজের নেতৃত্বে ৪-৫ জন শ্রমিক একটি বড় ট্রাক্টরে করে কাটা গাছগুলো সরিয়ে নিচ্ছিল।
এ সময় গাছ পরিবহনের বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিকদের সর্দার মফিজ অকপটে স্বীকার করে বলেন,
”এই গাছ শাহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরিফ মাহমুদ দুলাল স্যারের নির্দেশে আমরা স-মিলে (করাত কল) নিয়ে যাচ্ছি।”
পরদিন শনিবার (১১ জুলাই) সকালে মুসলিম পাড়ায় মফিজ মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের সেই বিশাল আকৃতির সরকারি গাছগুলো তার বাড়ির সামনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে, যা প্রধান শিক্ষকের নির্দেশেই সেখানে মজুদ করা হয়।
বিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের ঘটনা এই প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রে এটিই প্রথম নয়।
শাহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হাজী সঞ্জীব আলীর ছেলে আব্দুল মান্নান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন,
“এর আগেও এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আরিফ মোহাম্মদ দুলাল একাধিক মূল্যবান গাছ কেটে নিজের জন্য আসবাবপত্র বানিয়েছেন। তিনি স্কুলের কোনো নিয়ম বা কারো অনুমতির তোয়াক্কা করেন না। নিজের ইচ্ছামতো স্কুলের সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে ব্যবহার করছেন।”
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আরিফ মোহাম্মদ দুলালের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গাছ কাটার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “গাছগুলো অনেক আগেই কাটা হয়েছে। তবে কোনো গাছ বিক্রি করা হয়নি, গাছগুলো এখানে এনে রাখা হয়েছে।”
অন্যদিকে, শাহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন,
“প্রধান শিক্ষক তার শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছেন, তার সাথে আমার কথা হয়নি। এই গাছ কাটার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস ঘটনার তীব্রতা স্বীকার করে বলেন,
“শাহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের গাছ কাটার ব্যাপারে প্রশাসনকে আগে কিছু জানানো হয়নি। বিষয়টি মাত্র অবগত হলাম। আমি এখনই সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখছি এবং ঘটনার সত্যতা যাচাই করে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি সম্পদ আত্মসাতের কোনো সুযোগ নেই।”
সুনামগঞ্জ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রিয়াজ উদ্দিন জানান, বন বিভাগকে অন্ধকারে রেখেই এই কাজ করা হয়েছে। কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উপজেলা প্রশাসনের সাথে দ্রুত যোগাযোগের কথা জানান।
সরকারি নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিদ্যালয়ের গাছ কেটে নিজের আখের গোছানোর এই দুঃসাহসের শেষ কোথায়—এখন এটাই শাল্লাবাসীর মূল প্রশ্ন। সচেতন মহল মনে করছেন, তদন্তপূর্বক এই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে বিদ্যালয়ের বাকি সম্পদও রক্ষা করা কঠিন হবে।

