
দলের চেয়ে মানুষ বড়, বিবেকই শেষ কথা
ব্যারিষ্টার সোহরাব খান চৌধুরী
“ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়”—এই কথাটি শুনতে গৌরবজনক, কিন্তু বাস্তবতা বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়: সত্যিই কি দল ব্যক্তির চেয়ে বড়? আমি মনে করি না। কারণ, বিবেকের চেয়ে বড় কিছু নেই। রাজনৈতিক দলগুলো যখন নিজেদের স্বার্থে দলীয় লোকদের ব্যবহার করে, তখন তেলবাজেরা পুরস্কৃত হয়, আর নীতিবানরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সেই কারণেই আত্মীয়স্বজনদের আগেভাগেই পালিয়ে যাওয়ার বার্তা জানিয়ে দেওয়া হয়, অথচ দলের শীর্ষ নেতারা ‘কিছুই জানেন না’। আবার শোনা যায়—দলীয় কিছু লোক চায়নি বলেই তাদের নেত্রীর বাড়ির সামনের গেট থেকে বালুর ট্রাক পর্যন্ত সরানো হয়নি। এই নিষ্ঠুর রাজনৈতিক খেলায় সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে সাধারণ মানুষ এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
ইতিহাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—লগি-বইঠা দিয়ে হত্যার পর বিজয়োল্লাস, ঢাকার সোহাগকে পাথর মেরে হত্যার পর নৃত্য, বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, আবরারকে রাতভর পিটিয়ে হত্যা, খুলনায় রগ কেটে হত্যা, সিলেটের খাদিজাকে বদরুলের চাপাতির কোপ—এসবই রাজনীতির রক্তাক্ত স্মারক। পাশাপাশি রাজশাহীর বাগমারার পূর্ণিমা শীল, দিনাজপুরের ইয়াসমিন, নোয়াখালীর সুবর্ণচরের পারুল আক্তার, কুমিল্লার মুরাদনগরের ধর্ষণ এবং সর্বশেষ মাগুরার ৮ বছরের শিশু আসিয়ার নির্মম ধর্ষণ ও হত্যা—সবই দলীয় ছত্রছায়ায় সংঘটিত বেদনাবিধুর বাস্তবতা। এরপর প্রতিবারই শুরু হয় সেই পুরনো খেলা—ব্লেম গেম। বিচার হয় না, হয় না জবাবদিহি। এসব অপরাধের জন্য যদি স্থানীয় নেতাদের সত্যিকারের জবাবদিহির আওতায় আনা যেত, তাহলে অনেক অন্যায় হয়তো ঠেকানো যেত।
দল নয়—মানুষই বড়। কারণ মানুষই আদর্শ ধারণ করে। কেউ মুজিবের আদর্শে রাজনীতি করে, কেউ জিয়ার দর্শনে। আজকের রাজনৈতিক দলগুলো আসলে ক্ষমতা ও সুবিধার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে—যেখানে আদর্শ নয়, চলে লুটপাট, দখল আর ষড়যন্ত্রের খেলা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ’৭১-এর আত্মত্যাগ এবং ২৪-এর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ—সবকিছুকেই আজ পদদলিত করছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে—আমরা মানুষ হবো কবে?
এই প্রশ্নের জবাবে একদিন নির্মিত হয়েছিল একটি চলচ্চিত্র—”আবার তোরা মানুষ হ'”। আমি আগেও বলেছি—মানুষ হয়ে জন্মানো সহজ নয়। আজকের বাস্তবতা প্রতিদিন তারই প্রমাণ দেয়।

