
দুঃসহ স্মৃতির সাক্ষী বীরাঙ্গনা টেপরী রানীর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ কৃত্য সম্পন্ন
বিজয় রায়, রাণীশংকৈল
(ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধিঃ
একাত্তরের বিভীষিকাময় দিনগুলো বুকে নিয়ে, দীর্ঘ অবহেলা আর সামাজিক গ্লানির বিরুদ্ধে সারাজীবন লড়ে যাওয়া বীরাঙ্গনা টেপরি রাণী আর নেই। ১২ মে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। বুধবার সকালে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম, রাণীশংকৈল থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ দিক। টেপরি রাণীর বয়স তখন ১৬ কিংবা ১৭। চারদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা। পরিবারকে রক্ষা করার তাগিদে এক অসহায় বাবা শেষ পর্যন্ত মেয়েকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তুলে দিতে বাধ্য হন। স্থানীয়দের ভাষ্য, সেই পথচলায় বাবা-মেয়ের মধ্যে কোনো কথা হয়নি—শুধু নীরব কান্নায় ভারী হয়েছিল চারপাশ। সাত মাস ধরে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন টেপরি রাণী। নিজের সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়ে তিনি বাঁচিয়েছিলেন পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবন। স্বাধীনতার পর তিনি বাড়ি ফেরেন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়। যুদ্ধ শেষে সমাজ তাঁর অনাগত সন্তানকে মেনে নিতে চায়নি। নানা চাপ এসেছিল গর্ভপাতেরও। কিন্তু বাবা মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, এই সন্তানই হবে তোর বেঁচে থাকার অবলম্বন। এরপর জন্ম হয় সুধীর বর্মনের। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশেও তাঁকে শুনতে হয়েছে অবমাননাকর কথাবার্তা। ছোটবেলা থেকেই সমাজের একাংশ তাঁকে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে কটাক্ষ করেছে।
আজ সেই সুধীর বর্মন পেশায় একজন ভ্যানচালক। অভাবের জীবন পেরিয়েও তিনি বহন করে চলেছেন মুক্তিযুদ্ধের এক নির্মম ইতিহাস। তাঁর ব্যবহৃত পুরোনো বাটন ফোনে এখনো বাজে— “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে…”।
দীর্ঘ সময় অবহেলায় কাটানোর পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান টেপরি রাণী। পরের বছর তাঁর জীবনের আত্মত্যাগের গল্প প্রকাশ্যে এলে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, শেষ জীবনে এই স্বীকৃতি তাঁকে কিছুটা হলেও মানসিক শান্তি দিয়েছিল। নাতনি জনতা এখন গর্ব করে দাদীর কথা বলেন। দেশের প্রয়োজনে দাদীর মতো ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতার কথাও জানান তিনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “টেপরি রাণী শুধু একজন বীরাঙ্গনা নন, তিনি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়। তাঁর জীবন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগের গভীরতা মনে করিয়ে দেয়। জীবদ্দশায় টেপরি রাণীর ইচ্ছা ছিল, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে লাল-সবুজের পতাকায় মোড়ানো হয়। বুধবার সকালে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে পূরণ হলো সেই ইচ্ছা। অভিমান, বেদনা আর আত্মত্যাগের এক দীর্ঘ ইতিহাস বুকে নিয়ে বিদায় নিলেন টেপরি রাণী। তবে তাঁর জীবনগাথা থেকে যাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে—এক বীর নারীর নীরব অথচ অমলিন সাক্ষ্য হয়ে।

