
পিতার আদর্শের প্রতিচ্ছবি: জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের সামঞ্জস্য
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা একসময় একটি দর্শন, একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং একটি রাষ্ট্রচিন্তার প্রতীক হয়ে ওঠেন। জিয়াউর রহমান তেমনই এক নাম। স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তক, আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপকার হিসেবে তিনি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে অম্লান। আর তাঁর রাজনৈতিক উত্তরসূরি তারেক রহমান দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন—তিনি শুধু শহীদ রাষ্ট্রপতির সন্তান নন, বরং তাঁর আদর্শিক উত্তরাধিকারের ধারকও বটে।
বেশ কয়েক বছর পুর্বে বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকে তারেক রহমানের লেখা “আমার বাবা আমার শিক্ষক” শীর্ষক স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধটি শুধু একটি আবেগঘন পারিবারিক স্মৃতির দলিল নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নৈতিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। লেখাটিতে তিনি তাঁর পিতা জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিজীবনের যে বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরেছেন—সততা, মিতব্যয়িতা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকা, সাধারণ মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আত্মসংযম—সেগুলোর প্রতিফলন বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকৌশলেও বিভিন্নভাবে দৃশ্যমান।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু জিয়াউর রহমানের জীবনাচরণ এবং তাঁর সন্তানদের প্রতি শিক্ষাদানের ধরন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। তিনি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং নিজের সন্তানদেরও শিখিয়েছেন—রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা মানেই ব্যক্তিগত অধিকার নয়। যে ঘটনাগুলো তারেক রহমান তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন, সেগুলো শুধু পারিবারিক স্মৃতিচারণ নয়; বরং একটি রাজনৈতিক দর্শনের বহিঃপ্রকাশ।
যেমন, স্কুলে যাওয়ার জন্য বড় সরকারি গাড়ি ব্যবহার করায় তিনি সন্তানদের তিরস্কার করে ছোট গাড়ি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে কম তেল খরচ হয়। আজকের বাস্তবতায় যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তখন এই ঘটনাটি নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বিরল শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তারেক রহমানও বারবার প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহারের প্রশ্ন সামনে এনেছেন।
একইভাবে, একজন প্রহরীকে গালাগাল করার কারণে গভীর রাতে নিজের সন্তানকে ঘুম থেকে তুলে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার ঘটনা একজন রাষ্ট্রনায়কের মানবিক চরিত্রের অসাধারণ উদাহরণ। এটি দেখায়, জিয়াউর রহমান মানুষের মর্যাদাকে কতটা গুরুত্ব দিতেন। সামাজিক অবস্থান নয়, একজন মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের সম্মান সমান—এই শিক্ষা তিনি সন্তানদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দিয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তারেক রহমানের বক্তব্য ও রাজনৈতিক আচরণেও সাধারণ কর্মী, তৃণমূল নেতা কিংবা গ্রামীণ মানুষের প্রতি যে গুরুত্ব দেখা যায়, তার পেছনে এই পারিবারিক শিক্ষার বড় ভূমিকা রয়েছে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর বাস্তববাদিতা। তিনি বুঝেছিলেন, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে দাঁড় করাতে হলে জনগণের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই তিনি কৃষি, উৎপাদন, গ্রামোন্নয়ন এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার উপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বিখ্যাত কর্মসূচি “খাল কাটা”, “গ্রাম সরকার”, “স্বনির্ভর বাংলাদেশ” ইত্যাদি কেবল উন্নয়ন প্রকল্প ছিল না; বরং জনগণকে সম্পৃক্ত করার রাজনৈতিক কৌশলও ছিল।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক চিন্তাধারাতেও একই বাস্তববাদী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে “রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত”, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে পরিণত করার যে প্রচেষ্টা তিনি বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন, তা অনেকাংশে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তারই আধুনিক সংস্করণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত সংযমী জীবনযাপনের অধিকারী। বঙ্গভবনের দর্জি দিয়ে নিজের পুরনো কাপড় ছোট করে সন্তানদের পরার ব্যবস্থা করা কিংবা বিদেশ সফরে সন্তানদের না নেওয়ার সিদ্ধান্ত—এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত সততার নয়, রাজনৈতিক নৈতিকতারও উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি সন্তানদের বুঝিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় সফর ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয় এবং ক্ষমতার সঙ্গে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা ভোগের মানসিকতা একজন নেতাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে এই ধরনের আত্মসংযম বিরল হয়ে উঠেছে। ঠিক এই জায়গাতেই তারেক রহমানের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে তাঁর পিতার দর্শনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোকে ডিজিটাল মাধ্যমে সক্রিয় রাখা, তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ বজায় রাখার মাধ্যমে নিজেকে শুধুমাত্র ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং তিনি নিজেকে একটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন।
তারেক রহমানের লেখায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসঙ্গ। তিনি উল্লেখ করেছেন, তাঁর বাবা নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন এবং সেনাসদস্যদেরও ফজরের নামাজে উদ্বুদ্ধ করতেন। ধর্মকে ব্যক্তিগত অনুশাসন ও নৈতিকতার উৎস হিসেবে দেখার এই প্রবণতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনেরও অংশ ছিল। তিনি কখনো ধর্মকে বিভাজনের হাতিয়ার করেননি; বরং জাতীয় ঐক্যের উপাদান হিসেবে দেখেছিলেন।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক বক্তব্যেও ধর্মীয় মূল্যবোধকে সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখা যায়। তিনি প্রায়ই জাতীয়তাবাদ, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক সংহতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। অনেকেই মনে করেন, এটি তাঁর পিতার রাজনৈতিক দর্শনেরই ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনপ্রিয়তার প্রশ্নে জিয়াউর রহমান একটি অনন্য নাম। তাঁর শাহাদাতের পর লাখো মানুষের কান্না, জানাজায় মানুষের ঢল এবং সর্বস্তরের মানুষের আবেগঘন অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, তিনি কেবল রাষ্ট্রপতি ছিলেন না; ছিলেন মানুষের হৃদয়ের নেতা। তারেক রহমান তাঁর লেখায় সেই আবেগঘন স্মৃতিগুলো তুলে ধরেছেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে। একজন সন্তান হিসেবে পিতার জন্য গর্ব, শোক এবং ভালোবাসা—সবকিছু মিলেমিশে সেখানে একাকার হয়েছে।
তবে এই লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি তাঁর বাবাকে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখেননি; বরং একজন শিক্ষক হিসেবে দেখেছেন। যে শিক্ষক তাঁকে শিখিয়েছেন কিভাবে ক্ষমতার মধ্যে থেকেও বিনয়ী থাকতে হয়, কিভাবে মানুষের মর্যাদা দিতে হয় এবং কিভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে হয়।
আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই শিক্ষাগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ জনগণ এখন শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা রাজনৈতিক সততা, নৈতিকতা এবং জবাবদিহিতাও দেখতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের জীবনাচরণ এবং তারেক রহমানের স্মৃতিচারণ নতুন করে রাজনৈতিক মূল্যবোধের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
এ কথা সত্য, রাজনীতিতে ব্যক্তি ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য থাকে। সময় বদলায়, প্রেক্ষাপট বদলায়, নেতৃত্বের ধরনও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য প্রজন্মান্তরে বহমান থাকে। জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে যে আত্মসংযম, দেশপ্রেম, কর্মনিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখা গিয়েছিল, তার প্রতিফলন বিভিন্ন মাত্রায় তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্যেও লক্ষ্য করা যায়।
একজন নেতা কেবল ভাষণ দিয়ে বড় হন না; তাঁর ব্যক্তিজীবনের আচরণ, পারিবারিক শিক্ষা এবং রাজনৈতিক দর্শনই তাঁকে ইতিহাসে স্থায়ী করে। জিয়াউর রহমান সেই অর্থে একটি রাজনৈতিক বিদ্যালয়ের নাম। আর তারেক রহমানের জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এই লেখাটি যেন সেই বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি উন্মুক্ত পৃষ্ঠা, যেখানে একজন পিতা তাঁর সন্তানকে শুধু আদর করেননি, গড়ে তুলেছেন একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাই এই লেখার গুরুত্ব শুধু আবেগে নয়, শিক্ষায়ও। কারণ এখানে আমরা দেখতে পাই—ক্ষমতা নয়, আদর্শই একজন নেতার প্রকৃত পরিচয়। আর সেই আদর্শ যদি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকে, তবেই একটি রাজনৈতিক দর্শন জীবন্ত থাকে মানুষের হৃদয়ে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com

