
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকির কারণ হতে পারে।ক্যাপ্টেন রেদওয়ান সিকদার।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত সাতই অগাস্ট চুক্তিতে সই করেছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।সামরিক শক্তির দিক থেকে তুরস্ক অনেকটা এগিয়ে রয়েছে, শীর্ষ তেল রফতানিকারক দেশ সৌদি আরব এবং পাকিস্তান বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সাধারণত সামরিক জোট গড়ে ওঠে কোনো একটি অভিন্ন শত্রুকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এই তিন দেশের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অভিন্ন শত্রু স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ যুক্তরাষ্ট্রের বহু পুরোনো এক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পুনরায় চাঙা করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থ হাসিল করতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই এমন সাবকন্ট্রাক্টেড ‘মধ্যপ্রাচ্যীয়’, ‘আরব’ কিংবা ‘মুসলিম’ ন্যাটো গঠনের স্বপ্ন দেখে আসছে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিন দেশ ‘সম্প্রতি এবং অবশেষে’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করায় তিনি নিজেকে ‘খুবই আনন্দিত’ বলে ঘোষণা করেছেন। এই নতুন চুক্তি মূলত ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র-প্রযোজিত সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন (সেন্টো), যা ‘বাগদাদ প্যাক্ট’ নামে বেশি পরিচিত, তার মডেল অনুসরণ করে গঠিত।মক্কা চুক্তি মূলত বিশ্বজুড়ে স্নায়ুযুদ্ধের শুরুর দিক থেকে চলে আসা মার্কিন নীতিরই এক নতুন সংস্করণ। যে নীতির মূল উদ্দেশ্য পশ্চিমাপন্থী বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা, তাদের মার্কিন অভিভাবক এবং তাদের অঘোষিত মিত্র ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়া। আর অবাক করার কিছু নেই যে এই নতুন চুক্তির আসল লক্ষ্যও হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শত্রুরা।
বিভিন্ন মাধ্যমে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির জোরালো আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে এই জোটে অংশ নিতে সরকার এবং বিরোধী দলের একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে। তবে সামরিক জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি কয়েকটি নেতিবাচক বিষয় আলোকপাত করা প্রয়োজন। প্রথমত দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের সংবিধানে এবং প্রথম সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে “জোট নিরপেক্ষতা” (Non-Aligned Movement) এবং “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়” নীতিটি যুক্ত করে নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। কোনো নির্দিষ্ট সামরিক জোটে যোগ দিলে এই ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হবে।কারণ স্থায়ী কোনো সামরিক বলয়ে ঢুকে পড়লে নিজেদের স্বাধীন বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে। বাংলাদেশ কার বিরুদ্ধে বা কোথায় যুদ্ধে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত নিজের হাতে রাখার স্বাধীনতা হারানোর শঙ্কা থাকে।
মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর বৈদেশিক নীতি ছিল সম্পূর্ণভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, স্বাধীন এবং জোট নিরপেক্ষ। তিনি কোনো পরাশক্তির সামরিক ব্লকে যোগ না দিয়ে বিশ্বের শোষিত মানুষের পক্ষে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি মার্কিন বা সোভিয়েত—কোনো শিবিরের অন্ধ অনুসারী হওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর নীতি ছিল “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়” এবং “জোট নিরপেক্ষতা” (Non-Aligned Movement)।
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মার্কিনপন্থী পররাষ্ট্রনীতির তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি। SEATO ও CENTO-এর মতো মার্কিন সামরিক জোটে পাকিস্তানের যোগদানেরও ঘোর বিরোধী ছিলেন। মওলানা ভাসানীর এই জোট নিরপেক্ষ নীতির প্রকাশ ঘটে ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে। তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগের বড় অংশ মার্কিন ঘেঁষা নীতি সমর্থন করলেও, ভাসানী জোট নিরপেক্ষ নীতিতে অটল থাকেন। এই মতভেদের জেরে তিনি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে প্রগতিশীল ও জোট নিরপেক্ষ ভাবাদর্শ নিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। তিনি মনে করতেন, পরাশক্তিগুলো স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সদ্য স্বাধীন হওয়া তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো আবার তাদের সার্বভৌমত্ব হারাবে। সাম্রাজ্যবাদীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম এবং ফিলিস্তিনের মতো মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সবসময় আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন।
ভৌগোলিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন ঘটতে পারে। এই জোটে পাকিস্তানের উপস্থিতি থাকায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে জটিলতা ও উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটার তাৎক্ষণিক একটি প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। কারণ তখন ভারত ভাব পারে সে অনিরাপদ। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত এবং পাকিস্তান বা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান যুদ্ধ লাগলে বাংলাদেশ পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য হবে। আল-কায়দা বা তালেবানদের টার্গেট হবে বাংলাদেশ। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে বাংলাদেশ রণক্ষেত্রে পরিনত হয়ে বোমার আঘাতে ধ্বংসস্তূপ হবে।সৌদি বা আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় ইরানের মজলুম জনতার বিরুদ্ধেও বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হতে পারে সামরিক উত্তেজনা।এ উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ওয়ার এবং প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে।
কিংবদন্তি মজলুম জননেতা ইমরান খানকে জেলে বন্দি রেখে বাংলাদেশের ৫ই জানুয়ারীর মতো একতরফা বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামাবাদ দখল করে অবৈধ ভাবে দেশ চালাচ্ছে শাহবাজ শরীপ! এর পেছনে আছে পাকিস্তানের খতরনাক সামরিক বাহিনী। যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ, বেলুচিস্তান, খাইবার পাকতুমে নির্বিচারে গণহত্যা চালানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে সৌদির বাদশাহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একান্ত অনুগত। ইসলামি শরীয়ত ব্যবস্থা এবং আধুনিক রাষ্ট্রের সর্বজন স্বীকৃত গণতান্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সৌদির সাধারণ নাগরিকদের জিম্মি করে রাজতন্ত্র কায়েম করছে। মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় ইরান এবং ফিলিস্তিনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতেও দ্বিধা করাবে না এই বাদশাহ। নিজদেশে অজনপ্রিয় অগ্রহণযোগ্য এইসব নেতাদের সাথে সামরিক চুক্তিতে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য বুমেরাং হবে।
১৯৯৯ সালেও তুরস্ক ছিলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ, আর সেই দেশটিই ২০১৮ সালে এসে বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। দেশটি এখন শীর্ষ দশ রফতানিকারক দেশের একটি হতে চাইছে।তুরস্কের ড্রোন ও ট্যাংকের সক্ষমতা এখন প্রমাণিত এবং একই সাথে খরচ কম কিন্তু সক্ষমতা বেশি এমন সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে তুরস্ক ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। তুরস্কের তৈরি বায়রাকতার টিবি ২ ড্রোন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এসব চালকবিহীন বিমান রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সামরিক কেনাকাটার উৎস বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য ভালো বিকল্প। দেশটি রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বরাবরই বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে আসছে।বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই তুরস্ক থেকে গ্রাউন্ড সার্ভেইলেন্স রাডার, সাঁজোয়া যান, পোর্টেবল জ্যামার, মিসাইল লঞ্চিং সিস্টেম, স্কাইগার্ড রাডার সিস্টেমসহ মাইন সুরক্ষিত সামরিক যান, বহুমাত্রিক রকেট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সহ নানা ধরনের সমরাস্ত্র কেনা হয়েছে।
এখন বাংলাদেশ চাইছে তুরস্ক ড্রোনসহ কিছু সামরিক সরঞ্জাম বাংলাদেশেই তৈরি করুক। সামরিক জোটে অংশ না নিয়ে তুরস্কের সাথে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে এখন গাজীপুরে সমরাস্ত্র কারখানার আধুনিকায়ন সহ বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা উন্নয়নে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারিত্ব বা পারষ্পরিক সহযোগিতা করা যায়। তাই ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক জোটে অন্তর্ভুক্তি নয়, অর্থনৈতিক-সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপান বা তুরস্কের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন বাংলাদেশের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ভারত কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে না ঝুঁকে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন” (Strategic Autonomy) বা “বহুমুখী ভারসাম্য রক্ষা” (Multi-alignment” বিদেশনীতির মাধ্যমে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরান এবং ইসরায়েল বা রাশিয়া এবং আমেরিকার সাথে সুসম্পর্কে রেখে চলছে, বাংলাদেশেরও তা অনুসরণ করা উচিত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো দেশের বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আবেগের ওপর নয়, বরং দেশের গণমানুষের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে চলা উচিত। কোনো একক আধিপত্যবাদ বা পরাশক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়লে দেশের সার্বভৌমত্ব বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা খর্ব হতে পারে, যা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের এড়িয়ে যাওয়া উচিত।
ক্যাপ্টেন রেদওয়ান সিকদার
স্টেট কাউন্সিলর, সাউথ এশিয়ান স্ট্রাটেজিক কংগ্রেস।

