
ভূমি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অবৈধ ড্রেজারে সয়লাব ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা! অসহায় ভুক্তভোগীরা
নিজেস্ব প্রতিবেদক
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় মাটিখেকো অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ী ও ভূমি কর্মকর্তাদের সমঝোতায় বিলীন হচ্ছে তিন ফসলি কৃষি জমি ভরাট হচ্ছে পুকুর ও ডোবা। অভিযোগ রয়েছে উপজেলা জুড়ে অর্ধশতাধিক ড্রেজার চলছে দাপটের সাথে। আর এসবের অন্তরালে রয়েছে উপজেলা ও স্থানীয় ভূমি কর্মকর্তা কর্মচারীদের যোগসাজশ এবং কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য। সংবাদ প্রকাশের পর পূর্বপরিকল্পিত ভাবেই কয়েক ফুট পাইপ ধ্বংস করেই লোক দেখানো ও দায়সারা অভিযানে সীমাবদ্ধ ভূমি কর্মকর্তাদের কার্যক্রম। মাটি খেকো ড্রেজার ব্যবসায়ীদের অনেকই দাবি করেন স্থানীয় কতিপয় সাংবাদিক সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ম্যানেজ করেই দিনে রাতে চালিয়ে যাচ্ছেন অবৈধ ড্রেজারে মাটি ব্যবসা। কতিপয় ড্রেজার ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, ড্রেজার প্রতি মাসিক ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয় ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের। প্রভাবশালী ড্রেজার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অনেকেরই আবার রয়েছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিক ও ভুক্তভোগী কৃষকরা অভিযোগ করেও পাচ্ছেন না প্রতিকার। উল্টো হুমকি ধমকি ও হয়রানীর ভয়ে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। অবৈধ ড্রেজারে মাটি উত্তোলনে কঠোর আইন ও নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেদারসে চালিয়ে যাচ্ছেন অবৈধ ড্রেজারে মাটির ব্যবসা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে অর্ধশতাধিক অবৈধ ড্রেজার মেশিন চলছে নির্বিঘ্নে৷ এতে করে বিলিনের পথে একরের পর একর কৃষি জমি৷ ভরাট হচ্ছে পুকুর, জলাশয় ও ডোবা। পরিবর্তন হচ্ছে জমির শ্রেনী। ফসলি জমির মালিকদের একপ্রকার জিম্মি করেই চলছে এ অবৈধ এই মাটি খননকারী দানব যন্ত্রগুলো ৷ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের উত্তর চান্দলা, বলাকিয়া, বাড়ানী, জামতলী, ভাংগাব্রীজ, দধিখলা,কান্দুঘর, নোনাডী, মাধবপুর, চান্দলা ইউনিয়ন বড়ধুশিয়াসহ আরো বিভিন্ন এলাকায় ২৫ টি ড্রেজার মেশিন চলছে। বাড়ানী বাসার মেম্বার বাড়ির পাশে চলমান ভাংঙ্গাব্রীজ এলাকার ড্রেজার ব্যবসায়ি মানিক মিয়া জানান, এলাকার প্রয়োজনে মাটি কাটি৷ সকলকে ম্যনেজ করেই করতে হয় ব্যবসা। এতে করে পাশের জমির মালিকদের বুঝিয়ে বা টাকা একটু বেশী দিয়ে জমি কিনে নেই৷ জমি ভাঙ্গা শুরু হলে সবাই মানে৷ চান্দলা ইউনিয়নের বড়ধুশিয়া, সবুজপাড়া, খলিফাপাড়া, দধিখলা, চরের ফাতর সহ বিভিন্ন এলাকা। শিদলাই ইউনিয়নের গোলাবাড়িয়া, বেড়াখলা, পূর্ব পোমকারা, দিঘীরপার, লাড়ুচো, শিদলাই ৭ নং,৮ নং ৯ নং ওয়ার্ড এলাকায়ও চলছে অবৈধ ড্রেজারের দৌরাত্ম৷ শশীদল ইউনিয়নের নাগাইশ এলাকায় নানান অজুহাতে ঘুঙ্গুর নদী থেকে একাধিক অবৈধ ড্রেজার দিয়ে চলছে রাত দিন মাটি উত্তলন৷ এছাড়া নাগাইশ, হরিমঙ্গল, সাজঘর, চৌব্বাস, দেউসে চলছে অবৈধ ড্রেজার৷ সাহেবাবাদ ইউনিয়নের সাহেবাবাদ, জিরুইন, টাকই, ছাতিয়ানিত। মালাপাড়া ইউনিয়নের কালাপানির জলার কৃষি জমি অধিকাংশই বিলিনের পথে৷ একস্থানে চলছে তিন চারটি ড্রেজার৷ এছাড়া পূর্ব চন্ডিপুর, রামনগর, দুলালপুর ইউনিয়ন, এবং সদর ইউনিয়নেও চলছে একাধিক অবৈধ ড্রেজার। এতে করে বিলিনের শত শত একর চাষ যোগ্য জমি৷ অবৈধ ভাবে জমি শ্রেণী পরিবর্তন করে পুকুর, জলাশয়, ডোবা ও নাল জমি ভরাট করে তৈরি হচ্ছে ভিটি। নাম প্রকাশ নানা করার শর্তে ভুক্তভোগী কৃষক ও সচেতন নাগরিকদের অনেকেই বলেন, ড্রেজার মালিদের কাছে আমরা জিম্মি৷ তারা প্রথমে ছোট জমিতে ড্রেজার বসায় পাশের জমি ভেঙ্গে পরলে বাধ্য হয়ে তাদের কাছে বিক্রি করতে হয় কম দামে৷ প্রশাসন, সাংবাদিক ও ভূমি অফিসের সবাইকে মেনেজ করে ড্রেজার চালায় মাটি খেকো সিন্ডিকেট ৷ স্থানীয় ভাবে প্রভাবশালী, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং অবৈধ ব্যবসার টাকা ও ক্ষমতার জোরে ভুক্তভোগীরাও যেন অসহায়।৷ ভূমি অফিস অভিযোগ করতে গেলে তাদের কাছে আগেই খবর চলে আসে। অভিযোগ করেও কোন লাভ হয় না।
উপজেলার প্রভাবশালী এসব ড্রেজার মালিকদের মাঝে রয়েছে দক্ষিণ নাইঘর এলাকার ময়নাল হোসেন, ধনু মেম্বার, গোলাবাড়িয়ার টিটু, জুজু মিয়া, মামুন, পোমকারার শাহিন, টাটাব্রীজের মাহবুব, টানব্রীজের সেলিম, শিদলাইয়ের জুলহাস, বড়ধুশিয়ার জাহাঙ্গীর, আলমগীর, জুম্মন, জসিম, ধানদৌলের জাকির, কাদের, নাগাইশের জালাল, রফিক, আরিফ,জুজু মিয়া, বাড়ানীর কামাল, মানিক, শিশন, সুমন, দধীখলার জব্বার, মকবুল ভান্ডারী, সুমন, চালনার শাহিন খান, টাটেরার তাজু, ছাতিয়ানীর তসলিম সহ আরো অনেকেই। উপজেলা জুড়ে মাটিখেকো ড্রেজার সিন্ডিকেটের সকলের সাথেই রয়েছে ভূমি কর্মকর্তাদের নিবিড় যোগাযোগ। প্রতিমাসেই কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যে নির্বিঘ্নে চলছে অবৈধ এসব ড্রেজারে বালু ও মাটি কাটার ব্যবসা। ফলে মাঝে মাঝে ভুক্তভোগীদের অভিযোগে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও লোকদেখানো অভিযানে কিছু সংখ্যক পাইপ ধ্বংস করা হয়। কাজের কাজ কিছুই না, এমনই অভিযোগ ভুক্তভোগী মহলের। ফলে অভিযানের পরপরই আবার নতুন উদ্যমে শুরু হয় মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলাম বলেন, কৃষি জমিতে ড্রেজার কোন ভাবেই চলতে পারেনা৷ কেউ জাড়িত থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অতি শীঘ্রই এসব অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হবে৷

